ডিজিটাল যুগে মানব পাচারের নতুন রূপ হিসেবে উঠে এসেছে ‘সাইবার দাসত্ব’। ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ও প্রলোভনের মাধ্যমে মানুষকে বিদেশে পাঠিয়ে তাঁদেরকে জোরপূর্বক সাইবার অপরাধে নিযুক্ত করা হচ্ছে। এতে শুধু ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না, বরং সমাজও ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ছে।
২০২৬ সালের আগস্টে ভারতের তেলেঙ্গানার মানচেরিয়াল ও নির্মল জেলার দুই ব্যক্তি মিয়ানমার থেকে এসওএস পাঠিয়ে জানান, প্রায় ৪০০ ভারতীয় নাগরিক একটি সাইবার প্রতারণা নেটওয়ার্কে আটকা পড়েছেন। কয়েক দিন আগে রাজস্থানে তদন্তে ধরা পড়ে আরেকটি চক্র, যারা ভারতীয়দের কম্বোডিয়ায় পাঠিয়ে প্রতারণার কাজে বাধ্য করছিল। এসব ঘটনা প্রমাণ করছে, চাকরি খোঁজার পথ এখন অনেক সময় জোরপূর্বক সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রি জানান, গত দেড় বছরে মিয়ানমারের প্রতারণা কেন্দ্র থেকে ২ হাজার ৪১১ জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ১৫০ জনের বেশি আটকা রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)ও জানিয়েছে, একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক ভারতীয়দের উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাঠাচ্ছে। সেখানে তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হচ্ছে।
সাইবার দাসত্বের শুরু হয় ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ ও চাকরি খোঁজার নেটওয়ার্কে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। কিন্তু বিদেশে পৌঁছানোর পর চাকরি থাকে না, বরং নথি কেড়ে নিয়ে তাঁদেরকে প্রতারণার কাজে বসানো হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও লাওসে প্রায় তিন লাখ মানুষ এভাবে প্রতারণার শিকার হতে পারেন। ৮০টিরও বেশি দেশের নাগরিক এসব চক্রে আটকা পড়েছেন। তাদের ওপর হুমকি, সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, একাকী বন্দিত্ব ও নথি বাজেয়াপ্ত করার মতো অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীদেরও অনেক সময় অপরাধী হিসেবে দেখা হয়। কারণ তাদের জোর করে প্রতারণায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
এখানে একটি বড় নৈতিক প্রশ্ন উঠে আসে, প্রতারণায় বাধ্য হওয়া মানুষ কি অপরাধী, নাকি ভুক্তভোগী? স্বেচ্ছায় প্রতারণায় যুক্ত হলে দায় থাকে, কিন্তু প্রতারণার ফাঁদে পড়ে জোরপূর্বক অপরাধে নিযুক্ত হলে তারা আসলে ভুক্তভোগী। তাদের অপরাধী হিসেবে দেখা হলে দ্বিতীয়বার অন্যায় করা হয়।
সাইবার দাসত্ব মানব মর্যাদাকে ধ্বংস করছে। প্রতারণা কেন্দ্রগুলো মানুষকে কেবল অর্থ উপার্জনের যন্ত্রে পরিণত করছে। তাদের ভাষাজ্ঞান, বুদ্ধি ও ডিজিটাল দক্ষতা ব্যবহার করা হচ্ছে অন্যদের ঠকানোর জন্য। এটি নৈতিকভাবে ভুল, কারণ মানুষকে কখনোই অন্যের আর্থিক লাভের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
প্রযুক্তি এখানে শৃঙ্খল হয়ে উঠছে। পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত, বন্দি কম্পাউন্ড, ঋণ, হুমকি বা কম্পিউটার স্ক্রিন; এগুলোই হয়ে উঠছে আধুনিক দাসত্বের হাতিয়ার। প্রতারণার বার্তার আড়ালে থাকে হয়তো একজন অপরাধী, আবার অনেক সময় থাকে একজন ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষ, যার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দিতে হবে, অপরাধীদের নয়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে পাচারকারী, দালাল, অর্থায়নকারী ও সংগঠকদের বিরুদ্ধে। আর ভুক্তভোগীদের জন্য প্রয়োজন আইনি সহায়তা, মানসিক পুনর্বাসন ও মর্যাদাপূর্ণ পুনঃএকীকরণের সুযোগ।
logo-1-1740906910.png)