Logo
×

Follow Us

বিশ্ব

বিশ্বজুড়ে প্রতারণার শিকার বাংলাদেশিরা

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৯:০১

বিশ্বজুড়ে প্রতারণার শিকার বাংলাদেশিরা

ইউরোপে প্রবেশের জন্য ভূমধ্যসাগর হয়ে লিবিয়া থেকে যাত্রা করা বাংলাদেশিদের সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট দিয়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এ পথে প্রাণহানি, নির্যাতন ও জিম্মি করে অর্থ আদায়ের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে লিবিয়া থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করা বাংলাদেশিদের বেশির ভাগই মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লার বাসিন্দা। চাকরির প্রলোভনে লিবিয়ায় পৌঁছালেও ৭৫ শতাংশ কোনো কাজ পাননি। বরং ৯৩ শতাংশ ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন এবং ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অধিকাংশই চলাফেরার স্বাধীনতা হারিয়েছেন এবং পর্যাপ্ত খাবার পাননি।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, “বাংলাদেশিরা এখন ইতালি ও গ্রিসে যাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে। কিন্তু এ পথে প্রাণহানি ও লিবিয়ায় ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অনেকে। পাচারকারীরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পিছিয়ে রয়েছে। মামলার বিচারও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে।”

শুধু ইউরোপ নয়, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ স্বেচ্ছায়ও সেখানে যাচ্ছেন। রাশিয়ায় আহত কয়েকজন বাংলাদেশি উদ্ধারের জন্য ব্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আবার মরদেহ দেশে ফেরত আনার আবেদনও এসেছে। পরিবারগুলো জানিয়েছে, নিরাপত্তারক্ষী বা কারখানার চাকরির প্রলোভনে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা নিয়ে তাদের রাশিয়ায় পাঠানো হয়। পরে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

বিদেশে কাজের প্রলোভনে নারীদের পাচারের ঘটনাও বেড়েছে। সৌদি আরব, দুবাই ও মালয়েশিয়ায় গৃহকর্মী বা বিউটি পার্লারের চাকরির কথা বলে অনেক নারীকে জোরপূর্বক যৌন ব্যবসায় যুক্ত করা হচ্ছে। পটুয়াখালীর লিজা আক্তার সৌদি আরবে গিয়ে চারবার হাতবদল ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরে আসেন তিনি। একইভাবে দিলরুবা আক্তার ও জান্নাত নামের তরুণী দুবাইয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নোয়াখালীর পহেলী আক্তারকে নাইটক্লাবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। পরে পরিবারের উদ্যোগে দেশে ফিরলেও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা এখনো বিচারাধীন।

কক্সবাজার উপকূল দিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি বাংলাদেশিদেরও মালয়েশিয়ায় পাচার করা হচ্ছে। ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সোয়া লাখ মানুষ পাচারের শিকার হন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা, বাহারছড়া, টেকনাফ সদর ও শাহপরীর দ্বীপ মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। গত তিন বছরে অন্তত তিন শতাধিক মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছেন। মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসার পরও অনেককে আবার পাচার করা হয়েছে।

টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাবের জানান, চার বছর আগে অপহরণকারীরা তাকে জিম্মি করে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাঠায়। নির্যাতনের কারণে তার মাথা ও চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন তিনি আগের মতো কাজ করতে পারেন না।

মানব পাচার এখন বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে প্রবেশ, রাশিয়ার যুদ্ধে মানবঢাল, নারীদের যৌন শোষণ কিংবা বঙ্গোপসাগর দিয়ে পাচার। আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবসে বার্তাটি স্পষ্ট- প্রতারণার ফাঁদে না পড়তে সচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরো জোরদার করতে হবে।

Logo