মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আমূল পরিবর্তন; পিছিয়ে বাংলাদেশ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪২
মাত্র চার বছরের ব্যবধানে মালয়েশিয়ার বিদেশি শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে বাংলাদেশ ছিল সবচেয়ে বড় শ্রমশক্তি সরবরাহকারী দেশ, সেখানে এখন শীর্ষস্থান দখল করেছে ইন্দোনেশিয়া। একই সঙ্গে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে এবং পুরো নিয়োগ ব্যবস্থা দ্রুত ডিজিটাল ও কঠোর নিয়ন্ত্রণভিত্তিক কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে দেশটিতে মাত্র ৭৭ হাজার ৮০৭ জন বিদেশি কর্মী প্রবেশ করেছেন, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৯১ শতাংশ কম। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে এসেছে ৩৫ হাজারের বেশি, নেপাল থেকে ২৫ হাজার এবং ভারত থেকে প্রায় ৬ হাজার কর্মী। বাংলাদেশ শীর্ষ তিন উৎস দেশের তালিকায় নেই।
কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক সংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। ২০২৩ সালে নতুন রেকর্ড গড়ে প্রায় ৪ লাখ বাংলাদেশি কর্মী সেখানে প্রবেশ করেন। তবে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির প্রভাব, চাকরি না পাওয়া, ঋণের বোঝা এবং শ্রমিক শোষণের অভিযোগ সামনে আসে। আন্তর্জাতিক মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি মালয়েশিয়া সরকার নতুন বিদেশি কর্মী নিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করে। বিদ্যমান কোটার ব্যবহার, শ্রমবাজারের ভারসাম্য এবং নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন নিয়োগ সীমিত রাখা হয়। ফলে ওই বছর বিদেশি কর্মী আগমন কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৬ হাজারে। ২০২৫ সালে তা আরো কমে মাত্র ৭৭ হাজারে নেমে আসে।
সরকার জানিয়েছে, নিয়োগদাতাদের বিদেশি কর্মী নিয়োগের হার কমে যাওয়ার পাশাপাশি নিয়োগব্যবস্থাকে আরো দক্ষ ও স্বচ্ছ করতে ধারাবাহিক সংস্কার চলছে। বর্তমানে বিদেশি কর্মীর কোটা আবেদন অনলাইনে গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে সময়, ব্যয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমছে।
দীর্ঘদিন ধরে ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (FWCMS) ব্যবহৃত হলেও এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এখন আলোচনায় এসেছে নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ইউনিভার্সাল রিক্রুটমেন্ট অ্যাডভান্সড প্ল্যাটফর্ম (তুরাপ)। সরকারের দাবি, এটি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরো প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত করবে। তবে সংসদ সদস্য ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি করেছেন।
দীর্ঘমেয়াদে সরকার ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড ইমিগ্রেশন সিস্টেম (নাইস) চালুর পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে বিদেশি কর্মী নিয়োগ, ভিসা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত সেবাগুলো একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যে পরিবর্তন ঘটছে তা সাময়িক নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত রূপান্তরের অংশ। ভবিষ্যতে কেবল বেশি সংখ্যক কর্মী পাঠানোই যথেষ্ট হবে না। নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুসরণ, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য যাচাই এবং কম অভিবাসন ব্যয় নিশ্চিত করতে পারলেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের জন্য এটি সতর্কবার্তা হলেও একই সঙ্গে নতুন সুযোগও। দক্ষ কর্মী তৈরি, ব্যয় কমানো এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আবারো মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান শ্রমশক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
logo-1-1740906910.png)