ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বড় ক্রীড়া উৎসবের সময় মানব পাচার ও শ্রমশোষণের আশঙ্কা নতুন কিছু নয়। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এই উদ্বেগ আবার জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে টিকিট কেটে বিদেশে থেকে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ অনিয়মিতভাবে অভিবাসন করার চেষ্টা করতে পারে, এমন শঙ্কা গত এক বছর ধরে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সংবাদপত্র ও সংসদীয় আলোচনায় উঠে এসেছে।
গবেষণা ও সাংবাদিক তদন্তগুলো থেকে পাওয়া মূল বার্তাটা সহজ: মেগা ইভেন্টগুলোতে ঝুঁকি বাড়ে, কিন্তু সব অভিযোগই একই রকম নয়। অনেক রিপোর্টে দেখা যায় যে সরাসরি বড় পরিসরের যৌনপাচার প্রমাণিত হয়েছে এমন দাবি সব সময় শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়ায় না। তবু শ্রমশোষণ, অনিয়মিত নিয়োগ, বেতন বঞ্চনা এবং দুর্বল তদারকির কারণে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর চাপ ও ঝুঁকি প্রকৃতেই বাড়ে।
বিশ্বকাপের সময় নির্মাণ, হোটেল, পরিষেবা ও নিরাপত্তা খাতে প্রচুর শ্রমিক দরকার হয়। অনেক দেশ থেকে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী আনা হয়। গবেষকরা বলছেন, যেখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়, সেখানে ভুয়া নিয়োগপত্র, অতিরিক্ত ফি, কাগজপত্র জটিলতা ও বাধ্যতামূলক কাজের মতো সমস্যা দেখা দেয়। এসব পরিস্থিতিতে কেউ কেউ টিকিট কেটে গিয়ে সেখানে থেকে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করলে তারা সহজেই অনিয়মিত অবস্থায় পড়ে যেতে পারে; কাগজপত্র না থাকা, কাজ না পাওয়া বা শোষণের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে টিকিট কেটে থেকে যাওয়ার শঙ্কা নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তাতে দুই ধরনের উদ্বেগ দেখা যায়। একদিকে আছে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উদ্বেগ; কোনো ব্যক্তি ভিসা বা ভ্রমণ শর্ত ভঙ্গ করে সেখানে থেকে গেলে কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অন্যদিকে আছে মানবিক উদ্বেগ, যারা অনিয়মিতভাবে থেকে যান, তারা সহজেই শোষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আইনি সমস্যায় পড়তে পারে। স্থানীয় সংবাদপত্র ও সংসদে এই দুই দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতারণা। অনলাইন রিক্রুটিং সাইট, সোশ্যাল মিডিয়া ও মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে ভুয়া চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে বিদেশে পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছে তারা কাগজপত্র, বেতন বা কাজের শর্ত নিয়ে প্রতারিত হয়। তাই তদন্তকারীরা বলছেন, ডিজিটাল ফরেনসিক্স ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের সঙ্গে সমন্বয় না বাড়ালে এই ধরনের অপরাধ ঠেকানো কঠিন।
গবেষণা ও তদন্ত থেকে যে সুপারিশগুলো সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে, সেগুলো হলো ইভেন্ট আয়োজনের আগে ও পরে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় শক্তিশালী তদারকি চালানো; রিক্রুটিং এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করা; ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ ও নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা রাখা এবং ক্ষতিপূরণ ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর রেমেডিয়েশন মেকানিজম গঠন করা। আয়োজকদের ওপর মানবাধিকার দায়বদ্ধতা বাস্তবভাবে আরোপ করাও জরুরি।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপটে টিকিট কেটে থেকে যাওয়ার শঙ্কা বাস্তব এবং তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে সব ঘটনা একরকম নয়। নীতিনির্ধারকরা যদি আগে থেকেই শক্তনীতি, তদারকি ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা নিশ্চিত করে, তাহলে মেগা ইভেন্টগুলো আনন্দঘন ও নিরাপদভাবে আয়োজন করা সম্ভব। মিডিয়া ও তদন্তকারীদেরও উচিত চটকদার শিরোনামের পেছনে গিয়ে কাঠামোগত সমস্যা ও ভুক্তভোগীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, তাহলেই সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।
logo-1-1740906910.png)