আরো ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে অভিবাসন; বদলাচ্ছে পথ, বাড়ছে মৃত্যু
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০৯:৩১
বিশ্বজুড়ে অভিবাসন এখন আগের চেয়ে আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। নিউ ইয়র্কে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অভিবাসন পর্যালোচনা ফোরামে যখন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা বৈশ্বিক অভিবাসন চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করছেন, তখনই প্রশ্ন উঠছে— এই চুক্তি কি সত্যিই অভিবাসীদের পরিস্থিতি উন্নত করছে? আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) আঞ্চলিক পরিচালক ওসমান বেলবেইসি মনে করেন, উত্তর হলো ‘হ্যাঁ’। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও পথ পরিবর্তনের কারণে যাত্রা আরো দীর্ঘ, বিচ্ছিন্ন ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
২০২৫ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে ইতালি ও মাল্টায় পৌঁছেছে প্রায় ৬৬ হাজার ৫০০ মানুষ, যা আগের বছরের প্রায় সমান। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথে গ্রিস, সাইপ্রাস ও বুলগেরিয়ায় আগমন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় পথে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে। আর পশ্চিম আফ্রিকান আটলান্টিক পথে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জমুখী আগমন ৬২ শতাংশ কমেছে।
কিন্তু আগমন কমা মানেই নিরাপদ যাত্রা নয়। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথে মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা এক বছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকান আটলান্টিক পথে আগমন কমলেও মৃত্যুর সংখ্যা তেমন কমেনি। আর মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে ২০২৫ সালে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসন পথগুলোর একটি করে রেখেছে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সংঘাত শুরু হওয়ার পর সুদান এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতি সংকটের মুখে। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরে ফিরলেও প্রায় ৯০ লাখ মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত। এ পরিস্থিতিতে সুদানি নাগরিকরা পূর্ব ও মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে বেশি দেখা যাচ্ছে। তাদের জন্য এই যাত্রা কোনো পছন্দ নয়, বরং শেষ ভরসা।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চল বৈশ্বিক অভিবাসনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০২৫ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপে মানুষের চলাচল বেড়েছে। অনিয়মিতভাবে ইউরোপে পৌঁছানো প্রতি তিনজনের একজন ওই অঞ্চল থেকে এসেছে। যুব বেকারত্ব অনেক দেশে ২০ শতাংশের বেশি। জলবায়ুজনিত সংকট যেমন খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহ সংঘাত ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে মিলে অভিবাসনকে আরো জটিল করছে।
প্রথমত, উদ্ধার ও অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আগমন কমলেও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, যা দেখিয়ে দিচ্ছে আরো শক্তিশালী সমন্বয় ও নির্ভুল তথ্য জরুরি।
দ্বিতীয়ত, নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের পথ বাড়াতে হবে। বৈধ সুযোগ সীমিত থাকলে মানুষ অনিয়মিত পথে যেতে বাধ্য হয়। শ্রমভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা, পরিবার পুনর্মিলন ও মানবিক সহায়তার পথ ঝুঁকি কমাতে পারে।
তৃতীয়ত, নির্ভুল ও সমন্বিত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগমনের পরিসংখ্যান, মানুষের অভিপ্রায় ও মৃত্যু-নিখোঁজের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে বাস্তব চিত্র পরিষ্কার হয়।
সবশেষে, আরো জোরালো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। নিউ ইয়র্কে বৈশ্বিক অভিবাসন চুক্তির আলোচনায় ১৩০টি দেশ অংশ নিচ্ছে। তারা স্বীকার করছে, অভিবাসন কেবল গঠনমূলক অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
অভিবাসনকে নিরাপদ ও মানবিক করতে হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থা, শ্রমিক সুরক্ষা এবং জীবনরক্ষাকারী তথ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সীমান্তপাড়ের অপরাধী চক্র মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সঠিকভাবে এগোতে পারলে কম মানুষ কষ্ট পাবে, প্রাণহানি কমবে এবং আরো বেশি মানুষ উন্নতির সুযোগ পাবে।
logo-1-1740906910.png)