মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন দক্ষিণ এশিয়ার কৃষকদের ঘরে ঘরে প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই গ্যাসই নাইট্রোজেনভিত্তিক সার তৈরির মূল উপাদান। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচ বেড়ে গেছে, ফলে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষকরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ভারতের পাঞ্জাবের কৃষক রমেশ কুমার বলেন, সার দাম বাড়লে শুধু ফসল নয়, সংসারের খরচও টালমাটাল হয়। স্কুল ফি, মেয়ের বিয়ের খরচ সবকিছুই নির্ভর করছে ফসলের ওপর। একইভাবে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের কৃষকরাও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
ভারতে কৃষি খাতের আকার ৪০০ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের জীবিকা নির্ভর করে। দেশটির সার আমদানির প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে। পাকিস্তানে কৃষি জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ যোগান দেয়, আর তাদের সার আমদানির এক-চতুর্থাংশ এই রুট দিয়ে আসে। বাংলাদেশে কৃষি জিডিপির ১২-১৩ শতাংশ, যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ সার আমদানি হরমুজ হয়ে আসে। নেপালও প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।
সরকারগুলো আশ্বাস দিলেও মাঠে কৃষকদের আস্থা কম। কাশ্মীরের সরিষা চাষি গুলাম রাসুল বলেন, যুদ্ধের খবর এলেই সার দাম বেড়ে যায়। পাকিস্তানের কৃষক মুনির আহমদ বলেন, সার দাম বাড়লে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, কখনো সার পাওয়া যায়, কখনো পাওয়া যায় না, আর দাম সবসময়ই বেশি। নেপালের কৃষক মেঘনাথ আর্যালও আশঙ্কা করছেন, সময়মতো সার না এলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ভারত সরকার স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো ও বিকল্প উৎস খোঁজার কথা বলছে। পাকিস্তানও দেশীয় ইউরিয়া উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ চীন ও মরক্কো থেকে সার আমদানির পরিকল্পনা করছে। নেপালও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে জৈব সার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে।
তবুও কৃষকদের ভয় কাটছে না। কারণ সামান্য দেরি বা দাম বাড়লেই উৎপাদন কমে যায়, আর খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার মতো জনবহুল অঞ্চলে খাদ্যের দাম বাড়া মানে কোটি মানুষের জীবনে চাপ।
পাঞ্জাবের কৃষক রমেশ কুমার বলেন, এ বছর তিনি কম সার ব্যবহার করবেন, যদিও জানেন এতে ফলন কমবে। তার কথায়, “এটা ঝুঁকি, কিন্তু আমাদের আর কোনো উপায় নেই।”
অবশেষে কৃষকদের জন্য বিষয়টি শুধু যুদ্ধ নয়, বরং সংসার টিকিয়ে রাখার লড়াই। একদিকে স্কুল ফি, অন্যদিকে সংসারের খরচ সবকিছুই নির্ভর করছে ফসলের ওপর।
logo-1-1740906910.png)