মেঘালয়; উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড় আর ঝর্ণার রাজ্য। প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যে ভরপুর এই জায়গা ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এক স্বপ্নের গন্তব্য। চারদিকে উঁচু পাহাড়, মেঘের স্পর্শ, পাহাড় বেয়ে নেমে আসা অসংখ্য ঝর্ণা, স্বচ্ছ পানির নদী আর ছবির মতো সুন্দর গ্রাম; সব মিলিয়ে মেঘালয় যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। রাজধানী শিলংকে বলা হয় ‘প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড’। বাংলাদেশের সিলেট সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় খুব সহজেই কম খরচে শিলং, চেরাপুঞ্জি আর ডাউকি ভ্রমণ করা যায়।
ডাউকি ভ্রমণে সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থান হলো স্নোংপাডং গ্রাম, যেখানে রয়েছে উমগট নদী। ফিরোজা সবুজ পানির স্বচ্ছতায় নদীর তলদেশ খালি চোখে দেখা যায়। নৌকা ভ্রমণ কিংবা স্নোরকেলিং এখানে ভ্রমণকারীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। কাছেই মাওলাওং গ্রাম, যেটি এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে পরিচিত। বাঁশের ঝুড়ি আর গাছের উপর তৈরি বাড়ি গ্রামটির বিশেষত্ব।
শিলং শহরের কাছেই রয়েছে উমিয়াম লেক, যাকে স্থানীয়রা বড়পানি বলে। স্কটল্যান্ডের হ্রদের মতোই এর সৌন্দর্য। শিলং শহরের আরেকটি আকর্ষণ হলো এলিফেন্ট ফলস। তিন ধাপে গড়া এই জলপ্রপাতের নামকরণ হয়েছিল কাছের হাতির মতো দেখতে একটি পাথরের কারণে, যদিও ভূমিকম্পে সেটি আর দেখা যায় না। তবুও ঝর্ণার সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
চেরাপুঞ্জি বিখ্যাত তার বৃষ্টির জন্য। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় এখানে। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য ঝর্ণা আর রহস্যময় গুহা চেরাপুঞ্জিকে করেছে অনন্য। সেভেন সিস্টার্স ফলস, নোহকালিকাই ফল, মৌসিমাই গুহা আর আরওয়াহ গুহা ভ্রমণকারীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। নংরিয়াত গ্রামে রয়েছে ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ, যা প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এখানে ট্রেকিং করলে দেখা যায় রেইনবো ফলসসহ অসংখ্য ঝর্ণা আর স্বচ্ছ হ্রদ।
শিলং শহরের আশপাশে রয়েছে লাইতলাম ক্যানিয়ন, যা গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতোই বিস্ময়কর দৃশ্য উপহার দেয়। শিলং পিক থেকে পুরো শহর আর পাহাড়ের সারি দেখা যায়। এছাড়া গলফ লেক, ওয়ার্ডস লেক, লেডি হায়াদ্রি পার্ক, অল সেন্টস চার্চ, মদিনা মসজিদ আর ডন ভস্কো মিউজিয়ামও ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে।
মেঘালয় ভ্রমণের সেরা সময় বর্ষাকাল, মে থেকে অক্টোবর। তখন পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো সবচেয়ে প্রাণবন্ত থাকে। তবে শীতকালে, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, পাহাড়ের অন্যরকম রূপ দেখা যায়। তাপমাত্রা ৫ থেকে ১৫ ডিগ্রির মধ্যে থাকে।
ঢাকা থেকে শিলং যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সড়কপথে। শ্যামলী পরিবহন ভিসাসহ সরাসরি শিলং পর্যন্ত সেবা দিয়ে থাকে। অন্যভাবে সিলেট হয়ে তামাবিল সীমান্ত পার হয়ে ডাউকি থেকে ট্যাক্সি বা লোকাল গাড়িতে শিলং যাওয়া যায়।
থাকার জন্য শিলং শহরে নানা মানের হোটেল রয়েছে। পুলিশ বাজার এলাকায় বাজেট হোটেল থেকে শুরু করে লাক্সারিয়াস হোটেল পোলো টাওয়ার্স পর্যন্ত সবই পাওয়া যায়। ব্যাকপ্যাকারদের জন্য বাজেট হোস্টেলও আছে। খাবারের জন্য শিলং শহরে নানা রেস্তোরাঁ রয়েছে। স্থানীয় খাবারের মধ্যে শূকর ও মুরগির মাংস বেশি জনপ্রিয়। মুসলিম পর্যটকদের জন্য হালাল খাবারের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া মোমো আর স্ট্রিটফুডও শিলংয়ের বিশেষ আকর্ষণ।
কেনাকাটার জন্য শিলংয়ের পুলিশ বাজার সবচেয়ে জনপ্রিয়। স্থানীয় মধু, দারুচিনি, চেরি ব্র্যান্ডি ইত্যাদি কিনতে চাইলে সোহরাবাজারে যেতে পারেন।
মেঘালয় ভ্রমণে কিছু টিপস মাথায় রাখা জরুরি। যেহেতু এখানে প্রায় সব সময় বৃষ্টি হয়, তাই ছাতা, রেইনকোট আর ভালো গ্রিপের জুতা সঙ্গে রাখা উচিত। ইমিগ্রেশন অফিসে সকাল সকাল পৌঁছালে সময় বাঁচানো যায়। আর মানি এক্সচেঞ্জের রশিদ সঙ্গে রাখা ভালো, কারণ ইমিগ্রেশনে তা চাইতে পারে।
logo-1-1740906910.png)