ভ্রমণকারীদের কাছে নেপাল মানেই সাধারণত পশুপতিনাথ, জনকপুর বা কখনো মু্ক্তিনাথ। কিন্তু এর বাইরেও নেপালে রয়েছে বহু অজানা পবিত্র স্থান ও আধ্যাত্মিক পথ, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু তীর্থযাত্রার অংশ ছিল। এসব পথ শুধু মন্দির নয়, বরং নদী, বনপথ ও পাহাড়ি গিরিপথের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আধ্যাত্মিক ভ্রমণকে আরো গভীর করেছে।
অধ্যাত্মিক ভ্রমণকারী ও জ্যোতিষী জুগ্নু জানান, একসময় তীর্থযাত্রা ছিল পথনির্ভর। গঙ্গার সমতল থেকে ধীরে ধীরে হিমালয়ের পাদদেশে পৌঁছাতেন ভ্রমণকারীরা। নেপাল তখন কোনো শেষ গন্তব্য ছিল না, বরং উত্তর ভারত, মধ্য হিমালয় ও তিব্বতের সঙ্গে সংযোগকারী এক ধারাবাহিক পথ।
পশুপতিনাথ মন্দির বাগমতী নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় কাঠমান্ডু উপত্যকায় প্রবেশকারীদের জন্য এটি ছিল বিশ্রাম ও আচার পালনের জায়গা। জনকপুর মিথিলার আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে তীর্থযাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর মুক্তিনাথ, যা উচ্চতায় অবস্থিত, সেখানে পৌঁছাতে দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রা করতে হতো। এই শারীরিক কষ্টই তীর্থযাত্রার অংশ ছিল, যা ধৈর্য ও আত্মসংযমের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।
নেপালের আধ্যাত্মিক ভৌগোলিকতা আজও অনেক জায়গায় সময় ও মৌসুমের সঙ্গে বাঁধা। যেমন গোসাইকুন্ড হ্রদে যাওয়া যায় শুধু নির্দিষ্ট মাসে। কারণ আবহাওয়া ও পথের অবস্থা অন্য সময় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এভাবে প্রকৃতির নিয়মই তীর্থযাত্রাকে সীমিত ও উদ্দেশ্যমূলক রাখত।
তবে আধুনিক অবকাঠামো ও বিমান যোগাযোগের কারণে দীর্ঘ ভ্রমণ এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। ফলে যেসব জায়গায় পৌঁছাতে ধৈর্য ও পরিকল্পনা দরকার, সেগুলো ধীরে ধীরে ভ্রমণকারীদের কাছে কম পরিচিত হয়ে পড়ছে। সহজে পৌঁছানো যায় এমন স্থানগুলোতে ভিড় বাড়ছে, আর কঠিন পথগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে।
আরেকটি কারণ হলো এসব পথের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রচার নেই। বড় মন্দির শহরের মতো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নেই। স্থানীয় সম্প্রদায়ই মৌখিকভাবে তথ্য ছড়িয়ে দেয় কখন যাওয়া যায়, কোথায় থামতে হবে, কোন পথ এড়িয়ে চলতে হবে। ফলে এগুলো বাণিজ্যিক পর্যটনের বাইরে থেকে যায়।
এই কম পরিচিত পথগুলোতে ভ্রমণ করলে অভিজ্ঞতা হয় ভিন্ন। এখানে নেই বড় ভিড় বা সাজানো অনুষ্ঠান। দীর্ঘ পথ, অনিশ্চিত আবহাওয়া আর সীমিত সুবিধা ভ্রমণকারীদের ধীর করে দেয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে যাত্রার ধৈর্য ও সহনশীলতাই হয়ে ওঠে মূল শিক্ষা। অনেকেই বলেন, এই নির্জনতা ও কষ্টই ভ্রমণকে গভীর চিন্তা ও আত্মমগ্নতার সুযোগ করে দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ভ্রমণ ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটনের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় নেপালের এসব পথ আবারো আলোচনায় আসছে। তবে আশঙ্কা রয়েছে, এগুলোও যদি বাণিজ্যিক ভ্রমণের অংশ হয়ে যায়, তবে আধ্যাত্মিকতার মূল স্বাদ হারিয়ে যাবে।
logo-1-1740906910.png)