ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বর্তমানে এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ে নয়াদিল্লিতে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে এসেছেন মাত্র ৩৮ বছর বয়সী সের্জিও গোর। তিনি নতুন প্রজন্মের কূটনীতিক, যারা আদর্শিক ঘোষণার চেয়ে বাস্তব স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো গোর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের একজন বিশ্বস্ত সদস্য।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারি স্থবির হয়ে পড়েছিল। বাণিজ্য বিরোধ, রাজনৈতিক বক্তব্যে অবমাননা, পিছিয়ে যাওয়া কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন এবং নতুন ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগের প্রাথমিক তালিকা থেকে ভারতকে বাদ দেওয়া; সব মিলিয়ে সম্পর্ক স্পষ্টভাবে টানাপোড়েনে ছিল।
২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত করে। এর পেছনে ছিল রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানির কারণে আরোপিত জরিমানা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের অর্থনীতিতে, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি কমে যায় প্রায় ২৮.৫ শতাংশ।
রাষ্ট্রদূত হিসেবে গোরের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে এই শুল্কযুদ্ধের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা। সমাধান এমন হতে হবে, যাতে ভারত স্বস্তি পায়, আবার ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে আপস করার অভিযোগও না ওঠে।
দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই গোর একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগে ভারতকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। শুরুতে ভারতের নাম না থাকা ছিল কূটনৈতিক অপমান। অথচ বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অংশীদার হলো ভারত। গোরের ঘোষণায় সেই ভুল দ্রুত সংশোধিত হয়েছে।
ভারতে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের সম্ভাবনা আবার আলোচনায় এসেছে। প্রতীকী ও কৌশলগত দুই দিক থেকেই এটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে গোরের মন্তব্য যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফর ‘সম্ভবত এক-দুই বছরের মধ্যে’ হতে পারে, তা এই সম্ভাবনাকে কিছুটা দুর্বল করেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি বিস্তৃত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি। এতে শাস্তিমূলক শুল্ক তুলে নিয়ে হারকে প্রায় ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্র বার্তা দেবে ভারত কোনো সমস্যার উৎস নয়, বরং চীনের বিকল্প একটি স্থিতিশীল সরবরাহ-শৃঙ্খলের স্তম্ভ।
এই চুক্তি ছাড়া রাশিয়া থেকে কম দামে তেল কেনার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি বা পার্মিয়ান অঞ্চলের তেল নেওয়া ভারতের জন্য বাস্তবসম্মত হবে না। কিন্তু চুক্তি থাকলে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া সহজ হবে।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের উষ্ণতা ভারতে নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে। পাকিস্তানের খনিজ ও ক্রিপ্টো খাতে মার্কিন আগ্রহ, পাসনি বন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব সবই ভারতের নজরে রয়েছে। এই জটিল বাস্তবতায় গোরের ভূমিকা শুধু বার্তাবাহকের হলে হবে না, সমাধানসূত্র তৈরিতেও তাঁকে সক্রিয় হতে হবে।
logo-1-1740906910.png)