ক্রিপ্টোকারেন্সিতে এ বছর ২৭০ কোটি ডলারেরও বেশি চুরি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৩৫
২০২৫ সাল ক্রিপ্টোকারেন্সি জগতের জন্য ছিল ভয়াবহ। এ বছর বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ও ব্লকচেইন প্রকল্প থেকে মোট ২৭০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছে, যা ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠানগুলো এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই জানিয়েছে, এই বিপুল অর্থ চুরির পেছনে মূলত উত্তর কোরিয়ার সরকারি হ্যাকাররা দায়ী।
সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে দুবাইভিত্তিক ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে, যেখানে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা। এটি শুধু ক্রিপ্টো দুনিয়ার ইতিহাসেই নয়, মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক ডাকাতি হিসেবেও গণ্য হচ্ছে। এর আগে ২০২২ সালে রনিন নেটওয়ার্ক থেকে ৬২ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং পলি নেটওয়ার্ক থেকে ৬১ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়েছিল।
চেইন অ্যানালাইসিস ও এলিপটিকের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা এ বছর অন্তত ২০০ কোটি ডলার চুরি করেছে। ২০১৭ সাল থেকে তারা মোট প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ক্রিপ্টোকারেন্সি হাতিয়ে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির তহবিল জোগাড় করতেই দেশটি এই পথ বেছে নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বছরের অন্যান্য বড় হ্যাকিংয়ের মধ্যে রয়েছে সিটাস এক্সচেঞ্জ থেকে ২২ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ইথেরিয়াম ব্লকচেইনের ওপর তৈরি প্রটোকল ব্যালান্সার থেকে ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং ফিমেক্স এক্সচেঞ্জ থেকে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার চুরি। ব্যক্তিগত ক্রিপ্টো ওয়ালেট থেকেও প্রায় ৭ লাখ ডলার চুরির ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো ব্লকচেইন প্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রা, যা কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, টেথার ইত্যাদি জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশ্বজুড়ে লেনদেন ও বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়। এর লেনদেন সম্পূর্ণ অনলাইনে হয় এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তি প্রতিটি লেনদেনকে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠান, যা অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশ্ন উঠছে, ক্রিপ্টোকারেন্সি কি হুন্ডির বিকল্প হতে পারে? তাত্ত্বিকভাবে ক্রিপ্টো ব্যবহার করে প্রবাসীরা সরাসরি দেশে টাকা পাঠাতে পারেন। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলের জটিলতা এড়ানো যায় এবং লেনদেন দ্রুত সম্পন্ন হয়। তবে বাস্তবে এটি এখনো কার্যকর নয়। কারণ বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ নয় এবং এ ধরনের লেনদেন আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত, আইনগত স্বীকৃতি। বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ নয়। ফলে প্রবাসীরা এ মাধ্যমে টাকা পাঠালে তা আইনগত সমস্যায় পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, মূল্য ওঠানামা। ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম অত্যন্ত অস্থির। এক দিনে কয়েকশ ডলার ওঠানামা করতে পারে, যা প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি।
তৃতীয়ত, সাইবার নিরাপত্তা। ২০২৫ সালের চুরির ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে, ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ও ওয়ালেট হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। প্রবাসীরা যদি এ মাধ্যমে টাকা পাঠান, তবে তাদের অর্থ চুরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
চতুর্থত, ব্যবহারিক জটিলতা। ক্রিপ্টো লেনদেন করতে হলে ডিজিটাল ওয়ালেট, এক্সচেঞ্জ অ্যাকাউন্ট এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। সাধারণ প্রবাসীদের জন্য এটি জটিল।
২০২৫ সালের ক্রিপ্টো চুরির রেকর্ড বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল অর্থনীতির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের মতো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সাইবার অপরাধীরা ক্রিপ্টোকারেন্সিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। প্রবাসীদের জন্য ক্রিপ্টো হুন্ডির বিকল্প হতে পারে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। আইনগত স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে এ মাধ্যম ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে এখনো প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে।
logo-1-1740906910.png)