শরিফুল হাসানের কলাম
এলাম বার্সেলোনা, শুনলাম স্পেন প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:২২
বার্সেলোনায় বাড়ছে বাংলাদেশিদের পদচারণা, বাড়ছে দায়িত্বও। আসলে বার্সেলোনা মানেই যেন ফুটবলের শহর। মেসি, আর আজকের প্রজন্মের লামিনে ইয়ামাল, পেদ্রি, গাভি কিংবা রাফিনিয়াদের ক্লাব। তবে এখন এই ভূমধ্যসাগর-তীরের শহরটি আরেকটি পরিচয়ও তৈরি করছে- ইতালি ও পর্তুগালের পর ইউরোপে বাংলাদেশিদের অন্যতম বড় গন্তব্য হিসেবে।
রোমে ধারাবাহিক মতবিনিময় সভা শেষে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রতিনিধি দল আমরা গতকাল বিকেলে পৌঁছে যাই স্পেনের বার্সেলোনায়। ইতালির পর স্পেনেই এখন দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশিদের সংখ্যা। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ হলেও সবচেয়ে বড় বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে উঠেছে বার্সেলোনায়। শুধু গত মাসেই স্পেনে বসবাসরত বাংলাদেশিরা বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
চলতি বছর স্পেন সরকার নথিহীন অভিবাসীদের জন্য একটি বড় ধরনের নিয়মিতকরণ কর্মসূচি অনুমোদন করেছে। এর আওতায় কয়েক লাখ নথিহীন অভিবাসী ধাপে ধাপে আইনি স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ পাবেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশিও রয়েছেন। এ কারণেই অনেক প্রবাসীর মুখে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের প্রশংসা শোনা গেল।
শুনলাম আমরা অনেক আলাপ! গতকাল রাতে দীর্ঘ সময় ধরে আমরা বার্সেলোনার প্রবাসী বাংলাদেশিদের কথা শুনেছি। স্থানীয় কমিউনিটির নুরুল ওয়াহিদ ও আফাজ ভাইয়ের উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলাদেশিরা এসে অংশ নেন। আমরা ভেবেছিলাম এক ঘণ্টার একটি আলোচনা হবে, কিন্তু কথা বলতে বলতে তিন ঘণ্টা কেটে যায়। যাদের কারণে এমন আয়োজন সফল হলো সবাইকে কৃতজ্ঞতা।
এই যে গতকাল রাতে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি শুনেছি, তা হলো—“সবাই আমাদের কথা শোনাতে আসে, কিন্তু আপনারা এসেছেন আমাদের কথা শুনতে।” এই একটি বাক্যই যেন পুরো আয়োজনের সার্থকতা।
আলোচনায় প্রবাসীরা তাঁদের দৈনন্দিন জীবন, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা, কাগজপত্রের জটিলতা, পরিবারকে সঙ্গে আনার প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।
অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বাংলাদেশি স্পেনে চলে আসায় কিছু খাতে কাজের সুযোগের তুলনায় শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। তাই নতুন যারা আসবেন, তারা যেন আগে শ্রমবাজার সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে আসেন। আর যারা ইতোমধ্যে এসেছেন, তারা যেন অবশ্যই স্প্যানিশ ভাষা শেখেন এবং দক্ষতা বাড়ান। ভাষা জানলে কাজের সুযোগ, আয় এবং সমাজে একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পারিবারিক পুনর্মিলন। অনেক বাংলাদেশি তাঁদের পরিবারকে স্পেনে নিয়ে আসতে চান। কিন্তু ঢাকায় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় লাগে। যেহেতু ব্র্যাক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করছে, তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা।
একটি অত্যন্ত মানবিক দাবিও উঠে এসেছে। বার্সেলোনা বা মাদ্রিদে কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে মরদেহ দাফনের জন্য যেন ভ্যালেন্সিয়া পর্যন্ত নিয়ে যেতে না হয়; স্থানীয়ভাবেই যেন সম্মানজনক ও সহজ দাফনের ব্যবস্থা করা যায়— এমন প্রত্যাশা জানিয়েছেন প্রবাসীরা।
নিরাপদ, নিয়মিত ও দায়িত্বশীল অভিবাসনের বিষয়টি আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সবাই একমত হয়েছেন যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে বিপজ্জনক ও অনিয়মিত পথে ইউরোপে আসা কোনো সমাধান নয়। বৈধ ভিসা, নিয়মিত অভিবাসনপথ, গন্তব্য দেশের শ্রমবাজার সম্পর্কে আগাম ধারণা, ভাষা শিক্ষা এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের ওপর তাঁরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
একই সঙ্গে তাঁরা মনে করেন, প্রবাসীদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সঞ্চয়কে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রবাসী ও বিদেশফেরত মানুষের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহায়তার সুযোগ আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
বৈঠকে আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্র্যাকের সহ-অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রত্যাশা এবং ফ্রন্টেক্স ইউআরপি প্রকল্পের পুনরেকত্রীকরণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা তুলে ধরি। জানাই, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় আট হাজার বিদেশফেরত মানুষকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, মনোসামাজিক সহায়তা, চিকিৎসাসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক পুনরেকত্রীকরণসহ নানা ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। স্পেন থেকে ফিরে আসা অনেক বাংলাদেশিও এই সহায়তা পেয়েছেন। তাই কমিউনিটির সদস্যরা যেন প্রয়োজনে বিদেশফেরত মানুষকে ব্র্যাকের কাছে পাঠান, সেই আহ্বানও জানিয়েছি।
আপনারা জানেন, ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা, পরামর্শ ও প্রত্যাশা জানতেই আমাদের এই সফর। যাত্রা শুরু হয়েছে রোম থেকে। এরপর বার্সেলোনা। সামনে রয়েছে পর্তুগাল। ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিরা যদি নিজেদের অভিজ্ঞতা বা পরামর্শ আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান, তাহলে ইনবক্স বা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে পারেন।
শেষ করার আগে ফুটবলের প্রসঙ্গ না আনলেই নয়।
আজ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। পুরো স্পেনজুড়েই উত্তেজনা। বিমানবন্দর থেকে হোটেলে আসার পথে ট্যাক্সিচালককে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় বাচ্চার জন্য বার্সেলোনার জার্সি পাবো?
এরপর খেলা নিয়ে আলাপ। তিনি হেসে বললেন, “সেমিফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা নয়, ফ্রান্স- এটা কিছুটা স্বস্তির।” এরপর যোগ করলেন, “আর্জেন্টিনার সঙ্গে খেলতে হলে বার্সেলোনার অনেক মানুষের জন্য মেসির বিপক্ষে থাকা কঠিন হয়ে যেত!”
জানতে চাইলাম, যদি ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়? তিনি আবার হেসে বললেন, “আগে ফ্রান্সকে হারাই, তারপর সেটা ভাবা যাবে। তবে মেসির জন্য ভালোবাসা সব সময় থাকবে।”
শত বছরেরও বেশি ইতিহাসের ক্লাব বার্সেলোনায় আজ ইয়ামাল, পেদ্রি, গাভি, রাফিনিয়ারা খেলছেন। কিন্তু ২০০৪ থেকে ২০২১; এই ১৭ বছরে লিওনেল মেসি যে ভালোবাসা অর্জন করেছেন, পাঁচ বছর পরও মনে হয় তিনি যেন এখানেই আছেন।
হয়তো খেলাধুলাও আমাদের একটি বড় সত্য মনে করিয়ে দেয়— মানুষের চলাচল, সংস্কৃতির বিনিময় আর অভিবাসন মানব সভ্যতারই অংশ। নানা দেশ, নানা ভাষা, নানা বর্ণের মানুষ একসঙ্গে একটি দলের জার্সি গায়ে খেলতে পারে। পৃথিবীও ঠিক তেমনই—বৈচিত্র্যের মধ্যেই তার সৌন্দর্য।
ভালো থাকুন পৃথিবীর সব প্রবাসী। ভালো থাকুক সব বাংলাদেশি। ভালো থাকুক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।
(শরিফুল হাসান ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান। বর্তমানে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে প্রবাসীদের সাথে দেখা করছেন, তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয় কথা বলছেন। তিনি এই বিরল অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত। মাইগ্রেশন কনসার্নকে তিনি এই লেখাগুলো পাঠকের জন্য প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন।)
logo-1-1740906910.png)