অবৈধপথে ইতালি যাত্রা: দেশে-বিদেশে লেনদেন আড়াই হাজার কোটি টাকা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৩৬
বিপজ্জনক ও অবৈধপথে ইউরোপে যেতে বাংলাদেশিদের ঘিরে লেনদেন হচ্ছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে বাংলাদেশি তরুণরা ইতালিতে যাওয়ার বিপজ্জনক পথে পা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে বৈধপথে বিদেশের শ্রমবাজারে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও দিন দিন বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত পথে ইউরোপ বা ইতালির পথে যাত্রা। বিশেষ করে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছানোর প্রবণতা বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। কোন কিছুতেই তাদের ঠেকানো যাচ্ছে না। আর এই অবৈধপথে ইউরোপে যেতেই স্থানীয় আর বিদেশি দালালরা লেনদেন করছে বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টারের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইতালিতে সমুদ্রপথে যাওয়া অনিয়মিত অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই ছিল সবচেয়ে বেশি, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৩১ শতাংশ। প্রতি বছর ১২ থেকে ১৪ হাজার বাংলাদেশি এই পথে ইতালি পৌঁছায়, যদিও সংখ্যাটি দেশের বৈধ শ্রমবাজারে যাওয়া ১০ লাখের তুলনায় অনেক কম।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, যেখানে বৈধপথে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে কেন এতো ঝুঁকি নিচ্ছেন দেশের তরুণরা?
গবেষণাটি বলছে, বাংলাদেশের তরুণরা মধ্যপ্রাচ্যের বদলে ইউরোপ যেতে মরিয়া। অনেকেই শুরুতে বৈধ বা আধা-বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অনেক বেশি খরচ, দীর্ঘসূত্রতা বা ভিসা জটিলতায় কারণে তারা শেষ পর্যন্ত দালালদের মাধ্যমে অনিয়মিত পথে বিদেশ যেতে বাধ্য হন।
দালালরা অবৈধপথে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যেতে চাওয়াদের সরাসরি দুবাই হয়ে নিয়ে যায় মিসরে। তারপর মিসর থেকে লিবিয়ার বেনগাজি শহরে। এছাড়া শ্রীলঙ্কা হয়ে দুবাই, সরাসরি তুরস্ক হয়ে লিবিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশ হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশি তরুণদের।
এসব তরুণরা লিবিয়া হয়ে ইতালি যেতে ১০ থেকে ১৪ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ করেন, যা জোগাড় করতে পরিবার বা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়। ফলে মাঝপথে বিপদে পড়লেও তারা ফিরে আসতে পারে না। প্রায়ই তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য চাঁদা দাবি করে বিদেশি দালালরা।
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের পড়তে হয় কঠিন বাস্তবতায়।ভিনদেশি দালালদের কাছে কেউ আটকা পড়েন, জিম্মি হয়ে যান। লিবিয়ায় নির্যাতন বা জোরপূর্বক কাজ হয়ে ওঠে তাদের নিত্যসঙ্গী। অনেকে আবার ডিঙ্গি নৌকা বা প্লাস্টিক বোটে সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় প্রাণ হারান। আবার কেউ প্রাণ হারান লিবিয়ার মরুভূমিতে।
মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টারের গবেষণায় বলা হয়েছে, এই পুরো যাত্রাপথটি একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের দালালরা লোক সংগ্রহ ও টাকা ব্যবস্থাপনা করে, মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য দেশে ট্রানজিট সমন্বয় করা হয়, আর লিবিয়ায় স্থানীয় দালাল চক্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করে পুরো প্রক্রিয়া, যার মধ্যে রয়েছে আটক, মুক্তিপণ আদায় ও সমুদ্রপথে ইতালি পাঠানো।
গবেষণা বলছে, কেবল সীমান্তে কঠোরতা বাড়িয়ে এই প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব নয়। বরং বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো, দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণ এবং অভিবাসন খরচ কমানোই হতে পারে কার্যকর সমাধান।
গবেষণাটিতে বাংলাদেশের জন্য স্পষ্ট বার্তাও দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, বিদেশে কাজের সুযোগ থাকলেও দেশের তরুণদের অনিয়মিত পথে যাওয়ার ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি। আর এই ঝুঁকির ভার শেষ পর্যন্ত বহন করতে হচ্ছে অভিবাসীদেরই তাদের জীবনের বিনিময়ে।
logo-1-1740906910.png)