Logo
×

Follow Us

ইউরোপ

স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: যুদ্ধবিরোধী এক অমর কাব্য

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ১২:৫০

স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: যুদ্ধবিরোধী এক অমর কাব্য

বিশ্ব রাজনীতির আকাশ যখন আবারো ঘন হয়ে উঠছে যুদ্ধের অন্ধকারে, তখন হঠাৎই শান্তির পক্ষে এক দৃঢ় কণ্ঠ উচ্চারিত হয়েছে ইউরোপ থেকে। এ কণ্ঠ আকস্মিক, এ শব্দ অপ্রত্যাশিত। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ৪ মার্চ দেওয়া এক ভাষণে এমন অবিশ্বাস কিছু সত্যের কথা বলেছেন, যা তীব্র ও সাহসী, যার রেশ ধ্বনিত হচ্ছে প্রতিটি যুদ্ধগ্রস্ত জনপদের দেয়ালে দেয়ালে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সানচেজ তার দেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রুকূটি উপেক্ষা করে। সুষ্পষ্ট ভাষণে তিনি জানান, মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ যুদ্ধের আগুনে নয়, শান্তির পথেই রচিত হতে পারে।

তিনি বলেন, যখন অস্ত্র গর্জে ওঠে, তখন সবচেয়ে আগে নীরব হয়ে যায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন। যুদ্ধের প্রথম আঘাত পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর; বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, কর্মস্থল; সবখানেই। প্রতিটি সংঘাতের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অদেখা কান্না, ভাঙা পরিবার, হারিয়ে যাওয়া শৈশব এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

এই বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্পেন সরকারের অবস্থান তিনি তিনটি শব্দে তুলে ধরেন- “যুদ্ধের বিরুদ্ধে না।”

তার মতে, আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে সংঘাতের পথ বেছে নেওয়া শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং সমগ্র মানবসমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আঘাত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিহাস আমাদের এক কঠিন শিক্ষা দিয়ে গেছে। বহু যুদ্ধ শুরু হয়েছিল নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা বা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে। কিন্তু সময়ের দূরত্ব থেকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেসব সংঘাত প্রায়ই জন্ম দিয়েছে আরো গভীর অস্থিরতা, সহিংসতা এবং মানবিক সংকটের।

এই কারণেই তিনি সতর্ক করেন, একটি অবৈধতার জবাবে আরেকটি অবৈধতা, একটি সহিংসতার জবাবে আরেকটি সহিংসতা, শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে ঠেলে দেয় এমন এক বিপর্যয়ের দিকে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে ওঠে।

তার ভাষণে আরো উঠে আসে যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাবের কথা। যুদ্ধ শুধু সীমান্তের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না। এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে, জ্বালানি বাজারে, খাদ্য সরবরাহে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, আর সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ।

এই প্রেক্ষাপটে স্পেনের সরকার একাধিক পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত স্পেনের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে সরকার।

তবে এসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের বাইরেও স্পেন একটি বৃহত্তর নৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, বিশ্বের সমস্যার সমাধান বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র বা সামরিক শক্তির প্রদর্শনে সম্ভব নয়। টেকসই সমাধানের একমাত্র পথ হলো সংলাপ, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।

তিনি আরো বলেন, বড় বড় যুদ্ধ অনেক সময় শুরু হয় এমন এক শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া থেকে, যা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ভুল হিসাব, অপ্রত্যাশিত ঘটনা কিংবা প্রতিশোধের রাজনীতি; সব মিলিয়ে সংঘাত এমন এক দিক নেয়, যার পরিণতি কেউই আর থামাতে পারে না।

তাই ইতিহাসের সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোই আজকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। রাষ্ট্রগুলোকে মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, মানবতার রক্ষা করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব।

সানচেজ তার ভাষণে ভবিষ্যতের প্রতি এক আশাবাদী দৃষ্টি তুলে ধরেন। তার মতে, সহিংসতার যে চক্র অনেকেই অনিবার্য বলে ধরে নেয়, মানবজাতি চাইলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। পৃথিবী এখনো এমন এক ভবিষ্যৎ গড়তে সক্ষম, যেখানে যুদ্ধ নয়, সহযোগিতা হবে সম্পর্কের ভিত্তি।

কারণ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত লাভবান করে অল্প কয়েকজনকে, যারা অস্ত্র বিক্রি করে, যারা ক্ষমতার খেলায় জয়ী হয়।

কিন্তু শান্তি তৈরি করে অসংখ্য সম্ভাবনা মানুষের উন্নতি, সমাজের অগ্রগতি এবং সভ্যতার নতুন পথ।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই তুলে ধরেছে স্পেনের সরকার- একটি পৃথিবী, যেখানে সংঘাতের পরিবর্তে থাকবে সংলাপ, বিধ্বংসের পরিবর্তে নির্মাণ আর বিভাজনের পরিবর্তে মানবিক সহাবস্থান।

মানব সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে যুদ্ধ বহুবার এসেছে। কিন্তু প্রতিবারই মানুষের স্বপ্ন ছিল একটাই- একটি পৃথিবী, যেখানে শিশুরা যুদ্ধের শব্দ নয়, শুনবে ভবিষ্যতের নির্মাণের আহ্বান।

Logo