মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ: ইউরোপ অভিমুখে শরণার্থী ঢলের শঙ্কা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬, ১০:২৭
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনা এবং ইরানসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে ইউরোপ অভিমুখে একটি বড় ধরনের গণ-অভিবাসন বা মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ একটি জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবন বাঁচাতে ইউরোপের দিকে ছুটতে পারে। এই সম্ভাব্য ‘মাইগ্রেশন শক’ বা অভিবাসন চাপ সামলাতে ইউরোপীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে তাদের সীমান্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে বিশেষ প্রস্তুতি শুরু করেছে।
আইওএমের এই সতর্কবার্তার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং সেনজেনভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। অভিবাসন সংস্থার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ফলে কেবল শরণার্থী সংকটই বাড়বে না, বরং মানব পাচারকারী চক্রগুলোও এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অসহায় মানুষকে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় রুটগুলোতে অবৈধ অনুপ্রবেশের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অ্যামি পোপ তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, এটি কেবল একটি মানবিক সংকট নয়, বরং বিশ্বব্যাপী অভিবাসন ব্যবস্থার এক বড় পরীক্ষা। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিরাপদ অভিবাসন পথ সচল রাখার পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে ইউরোপের অন্তত ১০টি দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ অনুযায়ী, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং ডেনমার্কসহ বেশ কিছু দেশ শেনজেন এলাকার ‘মুক্ত চলাচলের’ নীতি সাময়িকভাবে শিথিল করে ‘অস্থায়ী সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ’ (Temporary Border Control) বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে। আগে যেখানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে কোনো পাসপোর্টের প্রয়োজন হতো না, এখন সেখানে স্থল, আকাশ এবং সমুদ্রপথে কঠোর তল্লাশি চালানো হচ্ছে। জার্মানি তার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের মেয়াদ ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার ঘোষণা আগেই দিয়েছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে আরো গুরুত্বের সাথে কার্যকর করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে উগ্রপন্থি বা অপরাধী গোষ্ঠীগুলো যাতে ছদ্মবেশে ইউরোপে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্যই এই পাসপোর্ট চেক এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশগুলো তাদের সীমান্তে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমেও নজরদারি চালাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ অভিবাসী, পর্যটক এবং আন্তঃসীমান্ত কর্মীদের ওপর। সেনজেনভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যাতায়াত করতে গিয়ে যাত্রীদের এখন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট চেক করাতে হচ্ছে, যার ফলে যাতায়াত সময় অনেক বেড়ে গেছে। অনেক সীমান্ত পয়েন্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট সৃষ্টি হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যদি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি বা উত্তেজনা প্রশমন না হয়, তবে ইউরোপের এই অভিবাসন নীতি আরো কঠোর হতে পারে। ইতোমধ্যে হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো অভিবাসীদের প্রবেশের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় কমিশন পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আইওএম এবং জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থাগুলো বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সীমান্ত রক্ষা করতে গিয়ে যেন কোনো নিরপরাধ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে না পড়ে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের আগুনের আঁচ এখন ইউরোপের সীমান্তেও লাগতে শুরু করেছে, যা আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অভিবাসনের মানচিত্রকে বদলে দিতে পারে।
logo-1-1740906910.png)