মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল তেলের ভাণ্ডার কেন আছে এবং কেন তা আজ সংকটে আটকে আছে; উত্তর লুকিয়ে আছে ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে। লক্ষ লক্ষ বছর আগে মহাদেশীয় সংঘর্ষের ফলে ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল জমা হয়। একই সংঘর্ষের কারণে আজ সেই তেল বের হওয়ার পথও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে হরমুজ প্রণালীতে।
ইরান এমন এক জায়গায় অবস্থিত, যেখানে আরবীয় টেকটোনিক প্লেট ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। এই সংঘর্ষে পৃথিবীর ভূত্বক ভাঁজ হয়ে তৈরি হয়েছে জাগরোস পর্বতমালা। পাহাড়ের চাপ আরবীয় প্লেটকে নিচে ঠেলে দেয়, ফলে তৈরি হয় ফোরল্যান্ড বেসিন, যেখানে কোটি কোটি বছর ধরে জৈব পদার্থ জমে তেল ও গ্যাসে রূপান্তরিত হয়েছে।
প্রাচীনকালে সমুদ্রের পানি ওঠানামার ফলে স্তরে স্তরে জৈব পদার্থ, শেল, বালুকাপাথর, চুনাপাথর ও লবণ জমা হয়। গভীরে চাপ ও তাপে এগুলো তেল ও গ্যাসে পরিণত হয়। বালুকাপাথর ও চুনাপাথরের ফাটলে এসব হাইড্রোকার্বন জমে থাকে, আর শক্ত ক্যাপরক সেগুলোকে আটকে রাখে। আজ এই অঞ্চলেই বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ তেলের ভাণ্ডার রয়েছে।
প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর আগে আরবীয় প্লেট উত্তর-পূর্ব দিকে সরে গিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এর ফলে তৈরি হয় জাগরোস পর্বতমালা, যা ১,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। পাহাড়গুলো নিজেরা তেল ধারণ করতে না পারলেও আশপাশের ভাঁজ ও ফাটলে বিশাল তেলক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
এই চাপের কারণে ভূত্বক নিচে বসে তৈরি হয়েছে পারস্য উপসাগরীয় বেসিন। উপসাগরটি অগভীর ও সংকীর্ণ, গড় গভীরতা মাত্র ১১০ মিটার। হরমুজ প্রণালীতে এসে এটি আরো সরু হয়ে যায়, যেখানে ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ ও জাগরোস পর্বতমালা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে এটি যেন একটি পাইপের বাঁক, যা তেলবাহী জাহাজের চলাচলকে সীমিত করে দিয়েছে।
আজ বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। ভূতাত্ত্বিক সংঘর্ষের কারণে তৈরি এই সংকীর্ণ পথ এখন মানবজাতির জন্য বড় কৌশলগত দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল তেলভাণ্ডার ও হরমুজ প্রণালীর সংকীর্ণতা একই ভূতাত্ত্বিক ঘটনার ফল। মহাদেশীয় সংঘর্ষে জমে থাকা তেল আজ বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণ, আবার সেই সংঘর্ষের কারণে তৈরি সংকীর্ণ প্রণালীই তেল পরিবহনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস তাই আজকের ভূরাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
logo-1-1740906910.png)