Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বিদেশফেরত নারীদের ক্ষুদ্র উদ্যোগে দিনবদল

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:০১

বিদেশফেরত নারীদের ক্ষুদ্র উদ্যোগে দিনবদল

ফরিদপুরের মাসুদা আক্তারের জীবন বদলে গেছে; একসময় নির্যাতন ও দারিদ্র্যের তলায় কাতরানো এই নারী এখন নিজের ফুড কার্ট চালিয়ে দুই কন্যার একমাত্র অভিভাবক হিসেবে পরিবারের ভরণপোষণ করছেন। এসএসসি পাসের পর আর্থিক সংকটে বিয়ে করে প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন মাসুদা। সেখানে স্বামীর অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য জানতে পেরে তিনি বাধ্য হন প্রতিরোধ করতে; অস্বীকৃতির ফলে তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। ছয় মাস সহিংসতা সহ্য করার পর ২০২১ সালে প্রতিবেশীর সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া, আর্থিকভাবে নিঃস্ব অবস্থায় মাসুদা তখন দুই কন্যাকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি ছিলেন।  

সুইজারল্যান্ডের সহায়তায় উইনরক ইন্টারন্যাশনাল দ্বারা পরিচালিত আশ্বাস প্রকল্পের আওতায় সারভাইভার হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর মাসুদা পেয়েছেন মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও ফুড কার্ট পরিচালনার ব্যবহারিক দক্ষতা। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি বাড়ির পাশে স্ট্রিট ফুড ব্যবসা শুরু করেন, বাড়ি থেকে অর্ডার নেওয়া ও কমিউনিটিতে খাবার সরবরাহ করে বর্তমানে মাসিক প্রায় ১২ হাজার টাকা আয় করছেন। এই আয়ের ফলে তিনি পরিবারের দৈনন্দিন খরচ চালাতে, দুই কন্যার শিক্ষা নিশ্চিত করতে ও সঞ্চয় ও পুনঃবিনিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছেন। মাসুদা এখন আশ্বাস প্রকল্পের একজন সারভাইভার লিডার; তিনি অন্য সারভাইভারদের সহায়তা করেন, সভায় অংশগ্রহণ করেন এবং নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন।  

মাসুদার গল্পই ছিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত উইমেন এন্টারপ্রেনিয়ার কনফারেন্স ২০২৫’-এর প্রাণ। ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চায়না ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলায় আশ্বাস প্রকল্পের আওতায় আত্মনির্ভরতা অর্জন করা নারী উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য প্রদর্শন ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। কনফারেন্সের মূল উদ্দেশ্য ছিল সারভাইভার-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগগুলোর বাজারে প্রবেশ, স্টার্টআপ সাপোর্ট ও আর্থিক সংযোগ বাড়ানো।  

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রদর্শনীতে প্রায় ১৩০ ধরনের পণ্য প্রদর্শিত হয়— খাদ্যপণ্য, পোশাক, হস্তশিল্প ও হ্যান্ডমেইড সামগ্রী। অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মূল্যবান প্রতিক্রিয়া ও বাজারসংযোগ পেয়েছেন। কনফারেন্সে অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় উঠে আসে সারভাইভার উদ্যোক্তাদের সামনে থাকা প্রধান বাধা বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা, পণ্যমান বজায় রাখা, ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিংয়ের ঘাটতি এবং আর্থিক সেবায় সীমিত অ্যাক্সেস। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টরদের অংশগ্রহণে স্টার্টআপ সাপোর্ট ও টেইলরড ফাইন্যান্সিয়াল প্রোডাক্ট তৈরির প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়।  

কনফারেন্সে ব্যবসা পিচ সেশনে নির্বাচিত উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও সহযোগিতার সুযোগ খুঁজে পান। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ডিজিটাল লিটারেসি প্রশিক্ষণ, পণ্য উন্নয়ন ও আইডিএলসি পুর্নোতা লোনের মতো সমর্থনের প্রতিশ্রুতি আসে, যা সারভাইভারদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বাজারসংযোগে সহায়ক হবে বলে আয়োজকরা মনে করেন। সমাপনী সেশনে প্রকল্প পরিচালক ও অংশীদাররা বলেন, সারভাইভারদের জন্য শুধু প্রশিক্ষণ নয়, পরবর্তী সময়ে বাজারে টিকে থাকার জন্য ধারাবাহিক সেবা ও নেটওয়ার্কিং প্রয়োজন।  

কনফারেন্স থেকে উঠে আসা সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিং উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারদের মাধ্যমে টেইলরড সাপোর্ট নিশ্চিত করা। আয়োজকরা মনে করেন, মাসুদার মতো সফল কেসগুলো প্রমাণ করে যে সঠিক প্রশিক্ষণ, মানসিক সহায়তা ও বাজারভিত্তিক সহায়তা দিলে সারভাইভাররা কেবল জীবিকা অর্জনই নয়, নেতৃত্ব ও সামাজিক মর্যাদাও ফিরে পেতে পারে।  

উইনরক ও অংশীদাররা বলছেন, ভবিষ্যতে এসব উদ্যোগকে আরো শক্তিশালী করে সারভাইভারদের জন্য টেকসই ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা হবে, যাতে তারা পুনরায় ঝুঁকিতে না পড়ে এবং নিজেদের ও পরিবারের জন্য স্থায়ী ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।

Logo