Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

জাপানের শ্রমবাজার ধরতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ?

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৪

জাপানের শ্রমবাজার ধরতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ?

জাপানের বর্তমান বার্ধক্যজনিত তীব্র শ্রমিক-সংকট এবং ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনসংখ্যার ঘাটতি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থানের এক বিশাল ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু যথাযথ দক্ষতা, জাপানি ভাষার উচ্চমানের জ্ঞান এবং চাহিদাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের চরম ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ এই সুযোগ পুরোপুরি হাতছাড়া করছে। দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক সেলিম রেজার সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, জনশক্তি রপ্তানিকে কৌশলগত দক্ষতা বা গুণগত মানের পরিবর্তে কেবল ‘সংখ্যার হিসাবে’ পরিমাপ করার মানসিকতা, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ব্যর্থতা এবং জাপানি নিয়োগকর্তাদের সাথে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে না পারার কারণেই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও এই জনমিতিক লভ্যাংশকে টেকসই কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের জন্য জাপানের শ্রমবাজারের সুযোগ নতুন নয়। ২০০৫ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘ আট বছরে মাত্র ৪১ জন কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়েছিল (যার মধ্যে বিএমইটি পাঠিয়েছিল ১২ জন এবং বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ২৯ জন)। এটি ছিল বাংলাদেশের নীতিগত ও প্রশাসনিক অদক্ষতার এক বিব্রতকর দৃষ্টান্ত। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ এবং ২০১৭ সালে আইএম জাপান (IM Japan) ও অন্যান্য সংস্থার সাথে সমঝোতার মাধ্যমে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কোনো বৃহৎ, ধারাবাহিক ও কাঠামোগত কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে রূপ নিতে ব্যর্থ হয়।

বিশেষ করে ২০১৯ সালে নির্দিষ্ট দক্ষতাভিত্তিক কর্মী বা এসএসডব্লিউ (SSW) পাঠানোর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও ভাষা শিক্ষা, কঠোর দক্ষতা যাচাই এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটেনি। উপরন্তু, জাপানি অভিবাসন কর্তৃপক্ষের গবেষণায় উঠে এসেছে যে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ থেকেও যাওয়া কর্মীরা স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের কারণে ব্যাপক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। চুক্তি স্বাক্ষরই যে সাফল্যের মাপকাঠি নয়, বরং কম অভিবাসন ব্যয় ও টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ। অতীতের অভিজ্ঞতা তা বারবার প্রমাণ করেছে।

বাংলাদেশের নীতি ও কার্যক্রমে চিহ্নিত ‘চারটি বড় ভুল’:

১. চাহিদার আগে প্রশিক্ষণ এবং চাকরির নিশ্চয়তা ছাড়াই বিনিয়োগ: বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ও বাস্তব নিয়োগ বাজারের মধ্যে রয়েছে এক বিরাট বিচ্ছিন্নতা। কোন খাতে, ঠিক কী পরিমাণ কর্মীর চাহিদা রয়েছে এবং জাপানি নিয়োগকর্তারা কী ধরনের যোগ্যতা চান—তা মূল্যায়ন না করেই ঢাকাকেন্দ্রিক বা খণ্ডকালীন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ফলে সনদ বিতরণকে সাফল্য ধরা হলেও প্রশিক্ষণের পর বাস্তব চাকরির সুযোগ না থাকায় তরুণদের অর্থ ও সময় দুটোই অপচয় হচ্ছে।

২. ভাষাকে দক্ষতার কেন্দ্রীয় শর্ত হিসেবে না দেখা: জাপানে কাজের ক্ষেত্রে ভাষার ওপর পূর্ণ দখল ছাড়া কাজ করা অসম্ভব। অথচ জাপানি ভাষা শিক্ষাকে সারাদেশে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ঘটানো হয়নি। উচ্চ ব্যয় ও ঢাকাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার কারণে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র বা সাধারণ মেধাবী তরুণদের পক্ষে ভাষা শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলোর প্রস্তুতি নেওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে।

৩. কম খরচে নির্ভরযোগ্য নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারা: বাংলাদেশের রিক্রুটিং সিস্টেমে অতিরিক্ত ফি, দালালদের দৌরাত্ম্য এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জাপানি নিয়োগকর্তারা অত্যন্ত শৃঙ্খলিত ও আস্থার পরিবেশ চান। রাষ্ট্র যদি সরাসরি মধ্যস্বত্বভোগী নির্মূল করে এবং গ্রহণযোগ্য অভিবাসন ব্যয়ের নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তবে স্রেফ জনশক্তির প্রাচুর্য দিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়।

৪. প্রতিযোগী দেশগুলোর গুরুত্ব ও প্রস্তুতি বুঝতে না পারা: জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশ একা নয়; ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ অন্যান্য প্রেরণকারী দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ভাষা শিক্ষা এবং নিয়োগকর্তাদের সাথে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক এগিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ কেবল ‘বড় শ্রমশক্তির দেশ’—এই আত্মতুষ্টিতে ভুগে প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশলগত অগ্রগতি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

জাপানের শ্রমবাজারের সম্ভাবনার দরজা চিরকাল খোলা থাকবে না। অতীতের ধারাবাহিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সস্তা শ্রমের উৎস হিসেবে নয়, বরং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশকে আত্মপ্রকাশ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন-

- ৫ বছর মেয়াদি পরিমাপযোগ্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।

- সনদপ্রাপ্তির সংখ্যা নয়, বরং বাস্তব কর্মসংস্থান ও কর্মীদের প্রকৃত আয় দিয়ে প্রশিক্ষণের সাফল্য মূল্যায়ন।

- জাপানি শিল্প সংগঠন ও নিয়োগকর্তাদের সাথে সরাসরি অংশীদারত্ব এবং ঢাকার বাইরে ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা পরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ।

- অভিবাসন ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

Logo