সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে চরম ক্ষোভ, অসন্তোষ ও গভীর পর্যালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। জীবিকার তাগিদে ভিটেমাটি বিক্রি কিংবা ৬-৭ লাখ টাকা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দেশ ছাড়ার পর অদক্ষ শ্রমিকদের এমন সলিল সমাধি ও করুণ পরিণতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের শারীরিক, মানসিক নির্যাতন এবং আইনি সুরক্ষার অভাব নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ বিচার প্রক্রিয়ার তিন বছর ধরে জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাসের চরম অবহেলা ও উদাসীনতা নাগরিকদের প্রতি সরকারি জবাবদিহিতাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশিরা যখন একদিকে ইউরোপগামী মিছিলে সাগরে ডুবে মরছেন, অন্যদিকে তথ্য ও সচেতনতার অভাবে রাশিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সামরিক সংঘাতের মুখে পড়ছেন। দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান ও উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে প্রতি বছর লাখ লাখ সম্ভাবনাময় তরুণ জীবন বাজি রেখে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ছেন। ৬-৭ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে ক্লিনার বা ঝাড়ুদারের কাজ খোঁজার পরিবর্তে, সেই অর্থ দিয়ে দেশেই আত্মকর্মসংস্থান ও ব্যবসা শুরু করার মতো স্থিতিশীল পরিবেশ ও পরামর্শের অভাবই মূল সংকট হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
দারিদ্র্য দূরীকরণে চীনের ইউনান প্রদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। এক সময়ের অনগ্রসর এই অঞ্চলটি আত্মকর্মসংস্থান, কৃষিজ খামার এবং প্রথাগত হস্তশিল্পের প্রসারের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তুলে এনেছে। চীনা সরকার স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে কোনো সাহিত্য বা সাধারণ বিষয়ের শিক্ষার্থীও একটি নির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতায় পারদর্শী হয়ে ওঠে, যা তাকে চাকরি ছাড়াও স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশেও হস্তশিল্প, কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সরকারি নীতিগত সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বিশ্ববাজারে স্থানীয় পণ্য রপ্তানির ব্যবস্থা করা জরুরি। তবে দেশীয় উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো স্থানীয় চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও অপরাধচক্রের প্রভাব। সরকার যদি অপরাধীদের কঠোর হস্তে দমন করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে দেশের অভ্যন্তরেই বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব।
বর্তমানে গতানুগতিক গৃহকর্মী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকদের না পাঠিয়ে, তাদের নার্সিং, শিশু সুরক্ষা (Childcare) এবং বয়স্কদের সেবাদান (Elderly Care)-এর মতো বিশ্বব্যাপী চাহিদাসম্পন্ন সেবামূলক খাতগুলোতে আন্তর্জাতিক মানে প্রশিক্ষিত করে তোলা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের মেধা ও শ্রম কেবল সাগরে ডোবা, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেওয়া কিংবা বিদেশে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার জন্য হতে পারে না। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে জায়গা করে নেওয়ার পাশাপাশি দেশেই উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা না গেলে এই অকাল মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয়।
logo-1-1740906910.png)