Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড

শ্রীলঙ্কা ঠেকাতে পারল, পারল না বাংলাদেশ!

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৭

শ্রীলঙ্কা ঠেকাতে পারল, পারল না বাংলাদেশ!

একই সৌদি আরব। মৃত্যুদণ্ডের মুখে দুই দেশের নাগরিক। কিন্তু পরিণতি দুই রকম!

এক ১৪ অক্টোবরই ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকের সাজা বাতিল করেছে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আদালত। অন্যদিকে, মক্কার একটি মসজিদে অশালীন কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এই দুই ঘটনা প্রবাসী নাগরিকদের সুরক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতার বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নেটিজেনরা। ব্লাসফেমির মতো কঠিন মামলায় মৃত্যুদণ্ড ঠেকিয়ে দিয়ে তার নাগরিককে রক্ষা করেছে, সেখানে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা কেন জানেই না? 

শ্রীলঙ্কার নাগরিকের ঘটনার কথা পরে আসছি, তার আগে দৃষ্টি দিতে চাই মক্কায় দুই বাংলাদেশির ঘটনায়। সৌদির গণমাধ্যম আজেল ডট কম, সৌদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়েছে, মসজিদের ভেতর অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ১৪ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। কিন্তু কারা এই আবদুল বাসির ও সিতি আক্তার। তারা কী অনৈতিক কর্মকাণ্ড করেছেন সেটি খবরে প্রকাশ করা হয়নি। তারা সৌদিতে কী কাজ করতেন এনিয়েও বিস্তারিত সৌদির বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে কোনো কিছু এখন পর্যন্ত জানানো হয়নি। 

তবে সৌদি আজেল ডট কম কিছু পাঠকের কমেন্ট আপনাদের পড়ে শোনাতে চাই। তাহলে হয়তো আন্দাজ করা যাবে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছে সৌদিতে।  

হালিম নামের একজন কমেন্টে সেকশনে লিখেছেন-

মনে হচ্ছে, এ ধরনের বৈষম্যমূলক আইন মূলত অভিবাসী শ্রমিকদের ওপরই প্রয়োগ করা হয়। অথচ একই দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী নাগরিকদের ক্ষেত্রে সব সময় একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হয় না। একজন অভিবাসী শ্রমিকও একজন মানুষ। তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার রয়েছে।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে যদি সত্যিই কারো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কেউ অভিবাসী শ্রমিক হলেই তিনি অন্যদের তুলনায় কম অধিকার ভোগ করবেন এমনটি গ্রহণযোগ্য নয়। অভিবাসী শ্রমিকদের শ্রম ও অবদানের সুফল গ্রহণ করা হবে, অথচ তাদের মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করা হবে- এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

মোহাম্মদ নামের আরেকজন লিখেছেন- 

এই আইনটি শুধু প্রবাসীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে নয়। আমি বলতে চাইছি না যে, এ ধরনের অনৈতিক কাজ বৈধ হওয়া উচিত। আমার বক্তব্য হলো, একই ধরনের কাজের জন্য দেশের সর্বত্র সবার ক্ষেত্রে একই আইন প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

মীর নিসার আলী নামের একজন কমেন্টসে লিখেছেন-

এ ধরনের ঘটনা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই একটি বিষয় উপেক্ষিত থেকে যায়। স্বল্প বেতনে কাজ করা অভিবাসী শ্রমিকরা বছরের পর বছর তাদের প্রিয়জনদের কাছ থেকে দূরে, নিঃসঙ্গতা ও নানা কষ্টের মধ্যে জীবন কাটান।

মসজিদের পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর অবমাননা আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য। তবে এমন কাজের পেছনের পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটও বোঝার চেষ্টা করা উচিত। একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, এ ধরনের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড কি অপরাধের তুলনায় আনুপাতিক ও যথাযথ শাস্তি ছিল?

এখানেই আসবে শ্রীলঙ্কান নাগরিকের উদাহরণটি। ১৪ অক্টোবর যে দিনটিতে প্রবাসী বাংলাদেশি বশির, সিতির শিরচ্ছেদ হচ্ছে, সেই দিনটিতেই গালফ নিউজ খবর করেছে, ২৭ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কান কর্মী আনোজান শি ভরাসার বিরুদ্ধে ফেসবুক পোস্টে ইসলাম অবমাননা বা ব্লাসফেমির মতো কঠিন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল। প্রথমে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও আপিলের পর মৃত্যুদণ্ড হয়। শ্রীলঙ্কা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের তৎপরতার পর সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আদালত মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট এ সিদ্ধান্তের জন্য সৌদি সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানান। 

অন্যদিকে, একই দিনে ১৪ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি নাজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। বাংলাদেশের জেদ্দা কনস্যুলেট জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের অবহিত করা হয়নি। তারা এ বিষয়ে কিছু জানেও না। এ ঘটনায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়ে কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছে। 

সৌদির বিচার প্রক্রিয়া পৃথিবীর অন্য দেশ থেকে ভিন্ন। নৈতিক আচার, ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলা এখানে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত অনৈতিক বিচার অত্যন্ত কঠোর। এসব ঘটনায় প্রায়ই মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। আবার অনেক দক্ষ কূটনৈতিক ততপরতার মাধ্যমে নানা দেশ তাদের নাগরিকদের বাঁচাতে সক্ষম হয়। 

শ্রীলঙ্কার ঘটনায় কূটনৈতিক ও আইনি তৎপরতার সাফল্য দেখা গেলেও, বাংলাদেশ কেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে জানতে পারেনি, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

যে দেশটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার, যাদের শ্রমে ঘামে উন্নতি হয় সৌদির অর্থনীতি, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে শক্তি পায় বাংলাদেশের অর্থনীতি, সেসব প্রবাসী শ্রমিকের জন্য বাংলাদেশের দরদ, যত্ন কতটা তা ফুটে উঠে। লঘু অপরাধে তারা যখন পায় গুরুদন্ড, তখন তাদের পাশে সর্বশক্তি নিয়ে পাশে থাকে না দূতাবাস। কারণ তারাই জানেই না কোথায় শ্রমিকদের সংকট, কোথায় তাদের দরকার সহায়তা।

Logo