প্রতিদিন ফিরছে ১৪ জন মৃত প্রবাসী; নীরব সংকটে বাংলাদেশ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৩
বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছেন প্রবাসীরা। কিন্তু সেই প্রবাসজীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব মানবিক সংকট। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে ৪ হাজার ৬০ বাংলাদেশি কর্মীর মরদেহ। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১৪ জনেরও বেশি প্রবাসী কর্মীর লাশ দেশে এসেছে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৭৩ দিনে এই মরদেহগুলো দেশে আনা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সৌদি আরবে। চলতি বছর দেশটিতে প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় অংশ সৌদি আরবে থাকায় মৃত্যুর সংখ্যাও সেখানে বেশি।
দৈনিক প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের পর সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে মালয়েশিয়ায়। অথচ দেশটিতে গত আড়াই বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগ প্রায় বন্ধ রয়েছে।
প্রবাসে মৃত্যুর পেছনের বাস্তবতা অনেক সময় আরো বেদনাদায়ক। পাবনার আল আমিন কম্বোডিয়ার একটি টাইলস কারখানায় কাজ করতেন। কর্মস্থলে শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে তিনি মারা যান। কিন্তু তার মরদেহ দেশে ফিরতে সময় লাগে প্রায় দেড় বছর। কারণ কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই এবং মরদেহ শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
এ ধরনের ঘটনা বিরল নয় বলে জানাচ্ছে অভিবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। বিশেষ করে যেসব কর্মী বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বিদেশে অবস্থান করেন, তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে আরো বেশি সময় লাগে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে দেশে ফিরেছিল ৩ হাজার ৬৫১ জন প্রবাসীর মরদেহ। করোনা মহামারির বছরে সেই সংখ্যা কমে ৩ হাজার ১৪০-এ নেমে আসে। তবে ২০২১ সালের পর থেকে আবার মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে স্পষ্ট তথ্যের অভাব। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে আসা মরদেহের ৬৬ শতাংশের ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ৩৪ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনা, আগুনে দগ্ধ হওয়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া এবং অন্যান্য কারণে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, “স্বাভাবিক মৃত্যু” হিসেবে উল্লেখ করা অনেক ঘটনার পেছনেই প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হয় না। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, মানসিক চাপ, আত্মহত্যা কিংবা অবহেলার অভিযোগ থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো যাচাই করা হয় না।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্র ও যাতায়াত-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা প্রবাসী মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাঁচ বছরে দেশে ফেরা ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহের মধ্যে ৩ হাজার ৬৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া কিংবা বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায়। শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২ হাজার ৬৪৯ জন।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠেছে অতিরিক্ত তাপমাত্রা। গবেষকরা বলছেন, নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে কর্মরত বাংলাদেশিদের অনেকেই প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। এতে কিডনি, হৃদ্যন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র ও মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, বিদেশে প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বৃদ্ধি এবং মরদেহ দ্রুত দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনিয়মিত কর্মীদের ক্ষেত্রেও সরকার সহযোগিতা করছে। একই সঙ্গে বিদেশে মৃত্যুর কারণ আরো গভীরভাবে যাচাইয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বর্তমানে দেশে আসা প্রতিটি মরদেহ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা সহায়তা দেয় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। পাশাপাশি পরিবারকে তিন লাখ টাকা আর্থিক অনুদান, জীবনবিমার সুবিধা এবং বিদেশে পাওনা ক্ষতিপূরণ আদায়ে সহায়তা দেওয়া হয়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই দাফন সহায়তা, অনুদান, বিমা ও ক্ষতিপূরণ মিলিয়ে শত কোটি টাকার বেশি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তবে খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব সহায়তা পেতে অনেক পরিবারকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে অনিয়মিত কর্মীদের পরিবার নানা জটিলতার মুখে পড়ে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান মনে করেন, শুধু মরদেহ দেশে আনা নয়, প্রতিটি মৃত্যুর কারণ তদন্ত করা জরুরি। কারণ জানা গেলে মৃত্যুঝুঁকি কমানোর কার্যকর নীতি গ্রহণ করা সম্ভব হবে। তার মতে, “প্রতি বছর মৃত্যু বাড়ছে। ২৫ থেকে ৩০ বছরের তরুণরাও মারা যাচ্ছেন। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সবচেয়ে বেশি মরদেহ আসে। প্রতিটি মৃত্যুর বিস্তারিত তদন্ত হলে ভবিষ্যতে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে।”
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। কিন্তু প্রতিদিন ১৪টির বেশি মরদেহ দেশে ফেরার এই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের আড়ালে এখনো অনেক অমীমাংসিত মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রশ্ন রয়ে গেছে।
logo-1-1740906910.png)