Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ধাক্কা, সেপ্টেম্বরে কর্মী যাওয়া কমেছে ২৯%

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৬

বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ধাক্কা, সেপ্টেম্বরে কর্মী যাওয়া কমেছে ২৯%

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত চলতি বছরে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ছাড়পত্র পাওয়া কর্মীর সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ কমেছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বিদেশে কাজের জন্য মোট ৭০ হাজার ৩০৪ জন কর্মী ছাড়পত্র পেয়েছেন। অথচ ২০২৫ সালের একই মাসে এই সংখ্যা ছিল ৯৯ হাজার ২৪ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমেছে ২৮ হাজার ৭২০ জন। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ২৯ শতাংশ।

তবে মাসভিত্তিক হিসাবে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্টে যেখানে ৬২ হাজার ৯২৪ জন কর্মী বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ৩০৪ জনে। ফলে এক মাসের ব্যবধানে কর্মী যাওয়া বেড়েছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা। মালয়েশিয়া, ওমান এবং বাহরাইনের মতো বাজার আংশিক বা পুরোপুরি সীমিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতও এখনো বাংলাদেশ থেকে স্বল্পদক্ষ কর্মী নিয়োগ পুরোপুরি স্বাভাবিক করেনি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মতে, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং সৌদি আরবে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমবাজারে এক ধরনের সতর্ক অবস্থান তৈরি হয়েছে।

শুধু সেপ্টেম্বর নয়, পুরো বছরের চিত্রও উদ্বেগজনক। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে বিদেশে গেছেন ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭৯ জন কর্মী। অথচ গত বছরের একই সময়ে বিদেশে গিয়েছিলেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯২ জন। সে হিসাবে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ২ লাখ ৬৯ হাজার, যা প্রায় ৩২ শতাংশ হ্রাসের সমান।

তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সৌদি আরব বাংলাদেশি কর্মীদের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হিসেবে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশটিতে যাওয়ার জন্য ৩২ হাজার ৯১৫ জন কর্মী ছাড়পত্র পেয়েছেন। আগস্টে এ সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ১৩৫ জন।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর। সেপ্টেম্বরে দেশটিতে গেছেন ৮ হাজার ৩০৬ জন কর্মী। এছাড়া কাতারে ৬ হাজার ২৮২ জন এবং মালদ্বীপে ৫ হাজার ১৫ জন কর্মী যাওয়ার অনুমোদন পেয়েছেন। কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও যথাক্রমে ৪ হাজার ৫৩৮ এবং ৪ হাজার ৪৪২ জন কর্মী গেছেন।

ইতিবাচক দিক হলো, ইউরোপের কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে পর্তুগালে গেছেন ১ হাজার ২৪৯ জন কর্মী, যা আগস্টের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। ইতালিতেও কর্মী যাওয়া বেড়ে ১ হাজার ৯৭ জনে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান মনে করেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়, শ্রমবাজার বৈচিত্র্য না আনাও সমস্যার বড় কারণ।

তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল ও মালয়েশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। নতুন শ্রমবাজার খোলা এবং বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।

তার দাবি, ব্রুনাই, জর্ডান ও সিঙ্গাপুরের মতো সম্ভাবনাময় বাজারে এখনো সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রয়েছে। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, সরকার পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ানোর আশা দেখছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নূর জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মক্ষম মানুষের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের ভাষাগত ও কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

এদিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মন্দা রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মাসিক প্রবাহ।

যদিও চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনো ইতিবাচক রয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছে ৮ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

ব্যাংকারদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি চ্যানেলের পুনরুত্থানও রেমিট্যান্স প্রবাহে চাপ তৈরি করতে পারে।

Logo