Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বিদেশে পাচার হচ্ছে অনলাইন জুয়ার টাকা, নাগালের বাইরে মূল হোতারা

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৪

বিদেশে পাচার হচ্ছে অনলাইন জুয়ার টাকা, নাগালের বাইরে মূল হোতারা

মাত্র ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে প্রায় ৬ লাখ টাকা জেতার পর নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেছিলেন রাজধানীর উত্তরা এলাকার বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন (ছদ্মনাম)। কিন্তু সেই লাভই শেষ পর্যন্ত তাকে বড় ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। আরও লাভের আশায় খেলতে গিয়ে এক পর্যায়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা হারান তিনি।

ফরহাদের মতো হাজার হাজার মানুষ এখন অনলাইন জুয়ার ফাঁদে আটকে পড়ছেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত দ্রুত বিস্তার লাভ করা এই অবৈধ ব্যবসা শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচারেরও মাধ্যম হয়ে উঠছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) চলতি বছরের এক সমীক্ষা বলছে, দেশে বর্তমানে ৫০ লাখের বেশি মানুষ অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ে জড়িত। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশই তরুণ ও যুবক। কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না হলে ২০২৭ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২ কোটির বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, অনলাইন জুয়ার অর্থ সাধারণত চার ধাপে বিদেশে পাচার করা হয়। প্রথম ধাপে থাকেন জুয়াড়িরা। তারা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে জুয়ার অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা করেন।

দ্বিতীয় ধাপে থাকে স্থানীয় এজেন্ট চক্র। তারা বিভিন্ন এমএফএস নম্বর ব্যবহার করে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে এসব নম্বর নিয়মিত পরিবর্তন করা হয়।

তৃতীয় ধাপে রয়েছে সুপার এজেন্টরা। তারা বিভিন্ন স্থানীয় এজেন্টের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ একত্র করেন এবং ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে পরবর্তী ধাপে পাঠান।

চতুর্থ ও শেষ ধাপে রয়েছেন মূল হোতারা। অভিযোগ রয়েছে, তারা দেশের বাইরে বসে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন এবং শেষ পর্যন্ত অর্থ তাদের হাতেই পৌঁছে যায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই অর্থ সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ডিজিটাল হুন্ডি, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, স্থানীয় ও সুপার এজেন্টরা সাধারণত একে অপরের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত নন। তারা টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপসহ এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। স্থানীয় এজেন্টরা জুয়াড়িদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ সুপার এজেন্টদের কাছে পাঠান। এর বিনিময়ে তারা শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পান।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, সুপার এজেন্টরাই মূলত প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ এবং তারাই জুয়ার সাইট পরিচালনা, অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনা ও অর্থ স্থানান্তরের দায়িত্ব পালন করে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ১১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তাদের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া নতুন 'জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬' কার্যকর হওয়ার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ ১১টি মামলায় ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে ১২ জন চীনা নাগরিকও রয়েছেন।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশই স্থানীয় বা সুপার এজেন্ট। মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের দাবি, এসব চক্রের নিয়ন্ত্রকরা সাধারণত চীন, রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

জিইডির সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার বর্তমানে ৬২ থেকে ৬৮ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে। প্রতি বছর এই বাজার ৪.৭ থেকে ৬.১ শতাংশ হারে বাড়ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬ হাজার ২২২টি ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাকাউন্টে ৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকার বেশি জমা হয়েছে। একই সময়ে এসব অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত সন্দেহজনক লেনদেনের সংখ্যা গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২০ সালে যেখানে ৫০টি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন পাওয়া গিয়েছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬টিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তাওহীদুল হক বলেন, অনেক তরুণ জুয়ার টাকা জোগাড় করতে চুরি করছেন, মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করছেন, এমনকি পরিবারের সদস্যদের অর্থও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কোনো ব্যক্তি পুরো মাসের বেতন একদিনেই জুয়ায় হারিয়ে ফেলছেন। এরপর ধার করে আবার খেলছেন। এতে পরিবারে আর্থিক সংকট, অশান্তি এবং সম্পর্কের অবনতি ঘটছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এজেন্ট গ্রেপ্তার করে সমস্যা সমাধান হবে না। অনলাইন জুয়ার মূল হোতা, অর্থ পাচার চক্র এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সমন্বিত ব্যবস্থা না নিলে এই অবৈধ ব্যবসা আরো বিস্তৃত হতে পারে। কারণ এখন এটি শুধু জুয়ার সমস্যা নয়, বরং অর্থ পাচার, সাইবার অপরাধ এবং সামাজিক সংকটের একটি বড় উৎসে পরিণত হয়েছে।

Logo