মানুষ চলে যায়। কখনো নিজের ইচ্ছায়। কখনো পরিস্থিতির কাছে পরাজিত হয়ে। কখনো রাজনীতি তাকে ঠেলে দেয়, কখনো অর্থনীতি, কখনো যুদ্ধ, কখনো সাম্প্রদায়িকতা, কখনো জীবনের নির্মম কোনো সিদ্ধান্ত। কিন্তু মানুষ কি সত্যিই চলে যেতে পারে?
শরীর চলে যায়। ঠিকানা বদলে যায়। পাসপোর্টে নতুন দেশের নাম লেখা হয়। নতুন শহরের রাস্তায় হাঁটতে শেখে মানুষ। নতুন ঘরের জানালায় নতুন আকাশ দেখতে শেখে। তবু কোথাও একটা উঠোন থেকে যায়। একটা পুরোনো পুকুর। একটা কাঁঠালগাছ। বৃষ্টির পরে কাদামাটির গন্ধ। বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে বাঁশঝাড়ের ছায়া। পাশের বাড়ির মানুষের ডাক। মায়ের কণ্ঠ। বাবার পায়ের শব্দ। আর থেকে যায় একটি প্রশ্ন— “আমাদের বাড়িটা এখন কেমন আছে?” বাস্তুচ্যুত মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো এটাই—সে চলে যায়, কিন্তু তার ভেতর থেকে তার বাড়িটা কখনো চলে যায় না।
গ্রিসের কোনো দ্বীপ থেকে যে মানুষ সমুদ্র পাড়ি দেয়, আর বাংলার কোনো গ্রাম থেকে যে মানুষ শহরে কিংবা অন্য দেশে পাড়ি জমায়—তাদের গল্প আলাদা হতে পারে। কিন্তু বুকের ভেতরের শূন্যতাটা আশ্চর্যভাবে একই। কারণ মাটি শুধু মাটি নয়। মাটি মানে শৈশব। মাটি মানে পরিচয়। মাটি মানে পূর্বপুরুষের কবর। মাটি মানে প্রথম হাঁটতে শেখা। প্রথম স্কুল। প্রথম বন্ধুত্ব। প্রথম বৃষ্টি। প্রথম হারিয়ে যাওয়া মানুষ। তাই পৃথিবীর যে প্রান্তেই মানুষ থাকুক, কোনো এক গভীর রাতে তার ভেতর থেকে একটি শিশু উঠে দাঁড়ায়। সে বলে—“চলো, একবার বাড়ি যাই।”
কিন্তু বাড়ি তো আর আগের মতো নেই। কেউ মারা গেছে। কেউ চলে গেছে। বাড়ির দেয়ালে নতুন রং হয়েছে। পুরোনো আমগাছটি হয়তো নেই। যে উঠোনে একসময় ঈদের সকালে মানুষ জড়ো হতো, সেখানে হয়তো এখন অন্য কারও ঘর। তবু স্মৃতির বাড়িটি ঠিকই আছে। সেই বাড়ির দরজায় এখনো তালা পড়ে না।
সেখানেই যেন বাস্তুভিটা। একটি ভার্চুয়াল উঠোন। যেখানে মানুষ তার হারিয়ে যাওয়া গ্রামের নাম লিখতে পারে। পুরোনো বাড়ির ছবি খুঁজতে পারে, কোনো হারানো প্রতিবেশীর খোঁজ পেতে পারে। বাবা-দাদার ফেলে আসা মাটির গল্প বলতে পারে।
এখানে মানুষ বর্ণে আলাদা। ধর্মে আলাদা। বিত্তে আলাদা। কেউ প্রজন্ম আগে ভিটা ছেড়েছেন, কেউ নিজেই ছেড়েছেন। কারও বাড়ি সীমান্তের ওপারে, কারও বাড়ি দেশেরই অন্য প্রান্তে। কিন্তু যখন কেউ লেখে— “আমাদের বাড়ি ছিল অমুক গ্রামে...” তখন আশ্চর্য এক নীরবতা নেমে আসে। কারণ সেই বাক্যের পরের গল্পটি সবাই বোঝে। সেটি কারও একার গল্প নয়। সেটি আমাদের সবার গল্প।
অভিবাসন মানবজাতির আদি ইতিহাস। মানুষ যুগ যুগ ধরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গেছে। নদী বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে, সীমান্ত বদলেছে, মানুষের পরিচয় বদলেছে। শুধু বদলায়নি মানুষের মাটির প্রতি টান।
একজন প্রবাসী যখন বিদেশের ব্যস্ত শহরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের শীতের সকালের কথা মনে করেন, কিংবা বহু বছর আগে ভিটা ছেড়ে যাওয়া কেউ যখন পুরোনো গ্রামের নাম শুনে হঠাৎ চুপ হয়ে যান—তখন বোঝা যায়, মানুষের শরীর যত দূরেই যাক, তার আত্মজীবনীর একটি পৃষ্ঠা সবসময় সেই মাটিতেই পড়ে থাকে।
সেই পৃষ্ঠার নাম বঙ্গভিটা। হয়তো সেখানে আর আমাদের ঘর নেই। হয়তো উঠোন নেই। হয়তো সেই মানুষগুলোও নেই। তবু মাটির গন্ধ আছে। স্মৃতি আছে। আর আছে ফিরে তাকানোর অধিকার।
তাই বঙ্গভিটা শুধু একটি ফেসবুক গ্রুপ নয়। এটি হয়তো ছড়িয়ে থাকা মানুষের জন্য একটি প্রতীকী উঠোন—যেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মানুষ একদিন এসে দাঁড়ায় এবং বলে, “আমি চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার বাড়ি আমাকে ছেড়ে যায়নি।”
হয়তো মানুষের সবচেয়ে গভীর দেশ কোনো মানচিত্রে নেই। সেটি থাকে স্মৃতিতে। আর সেই স্মৃতির দরজা খুলে দিলে আজও ভেসে আসে -“এই যে, ফিরে এসেছিস? অনেক দেরি হলো। তোর বাড়ি কিন্তু এখনো এখানেই।”
logo-1-1740906910.png)