বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি নারী বিদেশে গেছেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ৪২ হাজারের বেশি নারী ৪৮টি দেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি সৌদি আরব ও জর্দানে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, ইতালি, সিঙ্গাপুর, সাইপ্রাস, দক্ষিণ কোরিয়া, গ্রিস, যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনামসহ নানা দেশে নারী শ্রমিকের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এমনকি টোঙ্গা, বাহামাস, নিউজিল্যান্ড ও ফিজির মতো অপ্রচলিত গন্তব্যেও বাংলাদেশি নারী শ্রমিক যাচ্ছেন।
বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা বাড়লেও তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান বা চাকরির চুক্তিপত্র ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। ফলে গন্তব্য দেশে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পাসপোর্ট আটকে রাখা ও গৃহবন্দি করে রাখার মতো সমস্যায় পড়ছেন। কেউ কেউ ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে।
জাতীয় সংসদেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ জানিয়েছেন, গত আট বছরে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ১০০ নারী কর্মী মারা যাচ্ছেন। তিনি নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, সেফ হোম, বীমা সুবিধা এবং বিদেশি নিয়োগকর্তার সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার দাবি জানান।
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। বিদেশ থেকেও অভিযোগ জানানো যায়। সৌদি আরবে দুটি সেফ হোম চালু আছে, ওমানসহ আরো কয়েকটি দেশে সেফ হোম পরিচালনা হচ্ছে। ১০টি দেশে আইনি সহায়তা কার্যক্রম চলছে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় অংশই শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০২১ থেকে পাঁচ বছরে ৪১২ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে ৮৪ জন আত্মহত্যা করেছেন।
ওকাপের গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির কথা জানিয়েছেন। ৯৭ শতাংশ চিকিৎসাসেবা পাননি। ৮০ শতাংশ পর্যাপ্ত খাবার পাননি। ৮২ শতাংশকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। বেশির ভাগ নারী চাকরির চুক্তিপত্র ছাড়াই বিদেশে গেছেন। ফলে বেতন, ছুটি বা নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে প্রমাণ থাকে না।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সীমা জহুর বলেন, নারী শ্রমিকরা রেমিট্যান্স পাঠান বলে রাষ্ট্র উপকৃত হয়। অথচ তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। দালালরা উচ্চ বেতন ও ভালো পরিবেশের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অনেক নারী অমানবিক কর্মপরিবেশে পড়েন। প্রেম বা বিয়ের ফাঁদে ফেলে বিদেশে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, নারীরা যথাযথভাবে প্রস্তুত না থাকায় গৃহকর্মী বা অনানুষ্ঠানিক কাজে আটকে থাকেন। ভাষা, দক্ষতা ও গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ নারীদের নার্সিং ও পরিচর্যার কাজে প্রশিক্ষিত করছে। বাংলাদেশকেও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
logo-1-1740906910.png)