মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খুলতে যাচ্ছে। এতে নতুন আশার আলো দেখা দিলেও পুরনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সীমিত সংখ্যক এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়ার ফলে আবারো সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (FWCMS) প্রথমে ২৫টি এজেন্সির নাম প্রকাশ করে। পরে সমালোচনার মুখে তালিকা বাড়িয়ে ৩৩৮টি করা হয়। তবে এর মধ্যে ২৬টি প্রাইমারি এজেন্সি এবং বাকিগুলো সাব-এজেন্সি। ফলে নিয়োগ আদেশ আবারো প্রাইমারি এজেন্সির মাধ্যমে যেতে হবে। এতে সিন্ডিকেটের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি সেখানে কাজ করছেন। তারা দোকান, কারখানা, প্ল্যান্টেশন, ইলেকট্রনিকস শিল্প ও নির্মাণ খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। মালয়েশিয়ার সাবেক এমপি চার্লস সান্তিয়াগো একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশি শ্রমিক ছাড়া মালয়েশিয়ার অর্থনীতি টিকবে না।
তবুও এ বাজার বারবার বন্ধ হয়েছে। ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৯, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে নিয়োগ স্থগিত করা হয়। প্রতিবারই দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের মে মাসে সর্বশেষ বন্ধ হয়। তখন আশা করা হয়েছিল কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হবে।
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে মালয়েশিয়ার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট। প্রতিষ্ঠানটি FWCMS সিস্টেম তৈরি করে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয়। বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম আবদুল নর। রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি সিস্টেমটি চালু করান।
অভিযোগ ওঠে, এই সিস্টেম বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি করেছে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তার গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণ দাবি করা হয়েছিল। কিছুদিন সিস্টেম বন্ধ থাকলেও এখন আবার চালু হয়েছে।
সিন্ডিকেটের কারণে হাজারো শ্রমিক প্রতারিত হয়েছেন। অনেকেই প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। অতিরিক্ত খরচের বোঝা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করেছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শফিকুল ইসলাম নামে এক বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু এই শোষণমূলক নিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
সরকার বলছে, কিছু শ্রমিককে বিনাখরচে পাঠানো হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি সমস্যার সমাধান নয়। মূল বিষয় হলো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও সাশ্রয়ী করা। মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া উভয় সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে যে শ্রমিকরা আর প্রতারণার শিকার না হন। সিন্ডিকেট ভেঙে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তবেই শ্রমবাজার টেকসই হবে এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
logo-1-1740906910.png)