ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছাতে গিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের মৃত্যু ও মানব পাচারের ঘটনা বেড়েই চলেছে। আগস্টের শুরুতে লিবিয়া থেকে গ্রিসগামী নৌকায় ৩৮ জন বাংলাদেশি যাত্রা করেন। নৌকাটি জ্বালানি শেষ হয়ে ১১ দিন ভেসে থাকে। খাদ্য ও পানির অভাবে ৯ বাংলাদেশি মারা যান। পরে মিশরের উপকূলে ২৯ জনকে উদ্ধার করা হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্র ও স্থলপথে ইউরোপে পৌঁছেছেন ২৪,৩১৮ বাংলাদেশি, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি। ব্র্যাক ও ফ্রন্টেক্সের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত লিবিয়া হয়ে গ্রিসে পৌঁছেছেন ৩,৬০৮ বাংলাদেশি এবং ইতালিতে পৌঁছেছেন আরও ৪,২৪৯ জন। ২০০৯ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগরীয় রুটে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।
বাংলাদেশে মানব পাচার চক্র এখন শুধু ইউরোপগামী নৌকা নয়, বরং ক্যাম্বোডিয়ার ভুয়া কল সেন্টার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নিয়োগ এবং নারীদের চাকরির নামে পাচার; এসব নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে পাচারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে যাত্রা করেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৯০০ জন মারা যান।
বাংলাদেশ সম্প্রতি মানব পাচার ও অভিবাসন চক্র দমন আইন ২০২৬ পাস করেছে। এতে পাচার ও চোরাচালানকে একই আইনি কাঠামোয় আনা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সাইবার প্রতারণা ও ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে তরুণদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক অপরাধে নিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে।
স্থানীয় চাকরিতে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় হয়, অথচ ইউরোপে থাকা বন্ধু কয়েকগুণ বেশি আয় করে। পরিবার চাপ দেয়, দালাল সুযোগ দেখায়। ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করলে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। সামাজিক মর্যাদা ও তুলনামূলক বঞ্চনা তরুণদের মনে করে দেয়, বিদেশে যাওয়া সফলতার প্রতীক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দালাল ধরলেই সমস্যার সমাধান হবে না। গ্রাম থেকে শুরু করে ঢাকা, লিবিয়া হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছে। চাহিদা ও লাভ থাকলে নতুন দালাল তৈরি হয়। তাই সমাধান হতে হবে তিন স্তরে—
- ব্যক্তিগত পর্যায়ে তরুণদের সঠিক তথ্য, খরচ, ঝুঁকি ও বৈধ পথ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
- স্থানীয় পর্যায়ে দালাল ও নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে, সামাজিক চাপ কমাতে হবে।
- জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন, বৈধ নিয়োগ, ভিসা সুযোগ, শ্রম চুক্তি ও অভিবাসন কূটনীতি জোরদার করতে হবে।
ইউরোপও দ্বিধায় আছে। একদিকে তারা অনিয়মিত অভিবাসন কমাতে চায়, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, যা দক্ষতা উন্নয়ন ও বৈধ শ্রম অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে পারে।
তরুণরা জানে সমুদ্রে মৃত্যু হয়। তাদের প্রয়োজন বৈধ পথ- সহজ, সাশ্রয়ী ও বিশ্বাসযোগ্য। তাই আসল প্রশ্ন হলো, কেন বৈধ পথ তাদের কাছে দালালের পথের চেয়ে কঠিন মনে হয়।
logo-1-1740906910.png)