কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৮০ কিলোমিটার উপকূল দিনে পর্যটকদের কাছে নান্দনিক হলেও রাত নামলেই তা পরিণত হয় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের নিরাপদ রুটে। অরক্ষিত ঘাটগুলোকে কেন্দ্র করে বেড়েছে মানব পাচার ও অপহরণের ঘটনা। প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, পরে সাগরপথে পাচার এখন এ অঞ্চলের নিয়মিত চিত্র। দৈনিক সমকাল পত্রিকার বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিস্তারিত তথ্য।
প্রতিবেদকের ভাষ্যমতে, পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপহরণ ও মানব পাচার একই সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। হোয়াইক্যং, হ্নীলা, বাহারছড়া, টেকনাফ সদর ও শাহপরীর দ্বীপ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এসব এলাকায় পাহাড়ি সন্ত্রাসী ও স্থানীয়-রোহিঙ্গা দালাল চক্র সক্রিয়।
২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়াগামী তিন হাজার ৫৩৪ জনকে সাগরপথ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। এ সময় উখিয়া ও টেকনাফ থানায় ১২০টি মামলা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে সেন্টমার্টিন উপকূল থেকে একসঙ্গে ২৬৩ জনকে উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে গত তিন বছরে টেকনাফে ৩৩০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পাওয়া অনেক ভুক্তভোগী পরে মানব পাচারের শিকার হয়েছেন।
সাম্প্রতিক এক ঘটনায় হ্নীলা ইউনিয়নের মোস্তাক আহমেদকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। দরকষাকষির পর পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে তিন দিন পর মুক্তি পান তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মুক্তিপণ দিতে না পারলে অনেককে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
অপহরণের শিকার হয়ে পাচারের শিকার হয়েছেন কচুবনিয়ার মোহাম্মদ সাবের। তাকে পাহাড়ি আস্তানায় আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে শামলাপুর উপকূল থেকে ট্রলারে তুলে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়। চার বছর পর দেশে ফিরলেও নির্যাতনের কারণে তার শরীরে স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম জানিয়েছে, চলতি বছর আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। শুধু জুলাই মাসেই নিখোঁজ হয়েছেন প্রায় ৮০০ মানুষ।
মানব পাচারের ঘটনায় মামলা হলেও বিচার প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে আছে। ২০১২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ৬০০টির বেশি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪৮০টি এখনো বিচারাধীন। পৃথক ট্রাইব্যুনালের অভাব, সাক্ষী সংকট ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার কার্যক্রম এগোচ্ছে না। ফলে অনেক আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে আবারো পাচার চক্রে যুক্ত হচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ফরিদ উল্লাহ বলেন, সাত গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ অপহরণ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। সন্ধ্যার পর মেরিন ড্রাইভ এলাকায় একা চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, অপহরণ ও মানব পাচার রোধে অভিযান চলমান। তবে অপরাধীরা দ্রুত জামিনে মুক্ত হয়ে আবারো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, মুক্তিপণ আদায়ে ব্যর্থ হলে অপহৃতদের পাচারের শিকার করার ঘটনা পাওয়া গেছে। তাই সমন্বিত অভিযান ও জনসচেতনতা ছাড়া এ অপরাধ রোধ করা কঠিন।
logo-1-1740906910.png)