বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থার সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। একসময় কেবল বিত্তশালীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতেন, এখন মধ্যবিত্তের পাশাপাশি নিম্ন-মধ্যবিত্তরাও বিদেশমুখী হচ্ছেন। যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি বছর ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, জাপান, কোরিয়া, কাতার, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ অন্তত ১৯টি দেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন। দৈনিক যুগান্তর এ নিয়ে প্রকাশ করেছে বিশেষ প্রতিবেদন।
এ প্রতিবেদনে পাবনার নির্মাণ শ্রমিক মো. সোহাগের অভিজ্ঞতা এই সংকটকে স্পষ্ট করে। স্ত্রী সিমা আক্তারের জন্মগত হার্টের ছিদ্র সমস্যায় স্থানীয় চিকিৎসকরা ওপেন হার্ট সার্জারির পরামর্শ দেন। তারা জানান, অস্ত্রোপচারে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা মাত্র ৫০ শতাংশ। কিন্তু ভারতের নারায়ণা হেলথ হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তাররা জানান, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নেই, ওষুধেই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এমন অভিজ্ঞতা দেশের চিকিৎসকদের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, এমপি-মন্ত্রীসহ অনেকেই বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ সম্প্রতি বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, চিকিৎসকরা রোগীদের যথেষ্ট সময় দেন না, সঠিক রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থতা, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অব্যবস্থাপনা- এমন অন্তত ২১টি কারণে মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ২২ শতাংশ মানুষের প্রতি মাসে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয় এবং মোট খরচের ৭৯ শতাংশই রোগীদের পকেট থেকে আসে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি বলেছেন, প্রতি বছর বিদেশে চিকিৎসায় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। তিনি মনে করেন, চিকিৎসকদের দায়িত্ববোধ, সময়নিষ্ঠা ও মানবিক আচরণ ফিরিয়ে আনলেই দেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের মধ্যে হৃদরোগের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১৭ শতাংশ। এরপর কিডনি রোগ ১৪.৫ শতাংশ, অর্থোপেডিক সার্জারি ১১.৫ শতাংশ, লিভার ও ক্যানসার ১১ শতাংশ করে, নিউরোলজি ৯ শতাংশ, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও ইউরোলজি ৬ শতাংশ, নাক-কান-গলা ৫ শতাংশ এবং গাইনোকলজি, চোখ ও দাঁতের চিকিৎসা ২-৪ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি দেশের স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে বরাদ্দ ১ শতাংশেরও কম, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। ফলে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি রয়ে গেছে।
বিদেশি হাসপাতালগুলো বাংলাদেশে রেফারেল অফিস খুলে রোগী সংগ্রহ করছে। ভারতীয় ভিসা সেন্টারগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায়। ২০২২ সালে ভারত সরকার ১২ লাখ বাংলাদেশিকে ভিসা দিয়েছে, এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ মেডিকেল ভিসা। মালয়েশিয়া হেলথকেয়ার ট্রাভেল কাউন্সিল জানিয়েছে, ২০২২ সালে দেশটিতে সাড়ে ৮ লাখ বিদেশি চিকিৎসা নিয়েছেন, যার দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন বাংলাদেশিরা।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত বলেছেন, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য সরকারের কাছে নেই। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে আস্থা কমে গিয়েছিল। বর্তমান সরকার পরিস্থিতি উন্নয়নে কাজ করছে এবং শিগগিরই দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
দেশের স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার সংকট কাটাতে মানসম্মত চিকিৎসা, আধুনিক সরঞ্জাম, দক্ষ জনবল এবং রোগীর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বিদেশমুখী চিকিৎসানির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে না।
logo-1-1740906910.png)