বিএমইটির ক্লিয়ারেন্সেই ঘাপলা; প্রতারণা ও ঝুঁকিতে প্রবাসী কর্মীরা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৮
বৈধ কাগজপত্র ও সরকারি অনুমোদন নিয়েও হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী মানব পাচার, সাইবার প্রতারণা ও যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন হওয়ার মতো ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়ছেন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) কর্তৃক দেওয়া ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের ত্রুটিপূর্ণ যাচাইবাছাই প্রক্রিয়া এখন কঠোর নজরদারিতে এসেছে। দৈনিক কালবেলা এ নিয়ে প্রকাশ করেছে বিশেষ প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৮ মাসে বিএমইটি কম্বোডিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশিকে ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে। কিন্তু ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, এদের মধ্যে অন্তত এক হাজার মানুষ সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকা পড়েছেন। সেখানে তাদের বৈদ্যুতিক শক দিয়ে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হয়েছে। জুনে ৫৮৩ জন এবং জুলাইয়ের শুরুতে আরও ১০৯ জন ভুক্তভোগী দেশে ফিরেছেন। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তারা বৈধ ক্লিয়ারেন্স নিয়েই ঢাকা ছাড়লেও পৌঁছানোর পর চাকরির পরিবর্তে অপরাধী চক্রের হাতে বিক্রি হয়ে যান।
দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে অনেক বাংলাদেশি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। ২০২৫ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিযান চালিয়ে ৩২২ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এদের বেশির ভাগই প্রথমে বিএমইটির অনুমোদন নিয়ে ব্রাজিলে যান। শুধু নোয়াখালী থেকেই প্রায় এক হাজার মানুষ ব্রাজিলে গেছেন। ফেরত আসাদের দাবি, দালালের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে তাদের ৪৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে রাশিয়ায়। নির্মাণকাজের ভিসা নিয়ে যাওয়া প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশিকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন এখনো সক্রিয় যুদ্ধে নিয়োজিত এবং কয়েকজন নিহত হয়েছেন। সংসদে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন, চারজন কর্মী মারা গেছেন এবং তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে।
নীতিমালার বড় দুর্বলতা হলো ছোট ব্যাচের ছাড়। দূতাবাসের সত্যায়ন ছাড়াই সর্বোচ্চ পাঁচজন কর্মী বিদেশে যেতে পারেন। পাচারকারী চক্রগুলো বড় নিয়োগকে ছোট ছোট ব্যাচে ভাগ করে এই নিয়মের অপব্যবহার করছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ কর্মীই এই ছাড়ের আওতায় বিদেশে যাচ্ছেন।
প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, কম্বোডিয়া, লাওস ও ব্রাজিলের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্যে যাচাই-বাছাই আরো কঠোর করা হবে। দূতাবাসের সত্যায়ন ছাড়া আর কোনো কর্মীকে পাঠানো হবে না। বৈধ ওয়ার্ক ভিসা ও পূর্ণ যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক করা হবে।
অফিসিয়াল ক্লিয়ারেন্স থাকা সত্ত্বেও প্রবাসী কর্মীরা প্রতারণা, পাচার ও যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ছেন এটি বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থার বড় ব্যর্থতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিক্রুটিং এজেন্সি ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারলে সংকট আরো বাড়বে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও কঠোরতা এখন সময়ের দাবি।
logo-1-1740906910.png)