বাংলাদেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতি এখন দেশের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক আয় দেশে আসছে, যা লাখো প্রবাসীর পরিশ্রমের ফল। তারা শুধু পরিবার নয়, দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে তুলছেন। তবুও এই সাফল্যের পরও বাংলাদেশ এখনো পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি। সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয় পাতায় লেখা এক কলামে অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ মুন্সী মোহাম্মদ আশরাফুল আলম এ মত দেন।
তার মতে, দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, নীতি সংস্কার ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে পারলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন সম্ভব। তবে এই লক্ষ্য পূরণ শুধু বেশি কর্মী পাঠিয়ে নয়, বরং পুরো অভিবাসন কাঠামোকে দক্ষতানির্ভর করতে হবে।
কলামে আশরাফুল আলম আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মসংস্থান মূলত নিম্নদক্ষ শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। তারা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমঘন খাতে কাজ করেন। কিন্তু এই মডেল এখন সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। কম মজুরি, শোষণ এবং সীমিত উন্নতির সুযোগ তাদের আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহকে সীমিত রাখছে।
অন্যদিকে, অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি চ্যানেলের মাধ্যমে বিপুল অর্থ দেশে আসে না, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ঘাটতি দেখা দেয়। তাই রেমিট্যান্স বাড়ানোর পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
দক্ষতানির্ভর অভিবাসনই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ। টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা, কেয়ারগিভিং, লজিস্টিকস, হসপিটালিটি, শিল্পসেবা ও আধুনিক নির্মাণ খাতে দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, ইতালি, রোমানিয়া, পোল্যান্ড ও কানাডার মতো উচ্চ আয়ের দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে।
একই সঙ্গে হুন্ডি বন্ধে ব্যাংকিং সুবিধা, মোবাইল ওয়ালেট, কম ট্রান্সফার ফি ও আকর্ষণীয় এনআরবি পণ্য চালু করতে হবে। প্রবাসীদের শুধু রেমিটার নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
নারী কর্মীদের অংশগ্রহণও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। নার্সিং, কেয়ারগিভিং ও হসপিটালিটি খাতে প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে নারীরা বৈদেশিক আয় বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন।
মুন্সী আশরাফ অভিমন দেন, রেমিট্যান্সকে শুধু শ্রমনীতি নয়, জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। দক্ষতা, বাজার বৈচিত্র্য, আনুষ্ঠানিক প্রবাহ ও প্রবাসী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ সহজেই ৫০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স যুগে প্রবেশ করতে পারবে।
logo-1-1740906910.png)