Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বিদেশে ৪৫ লক্ষ নার্সের চাহিদা; ক্যারিয়ার গড়ার বিপুল সম্ভাবনা

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ০৯:৪৬

বিদেশে ৪৫ লক্ষ নার্সের চাহিদা; ক্যারিয়ার গড়ার বিপুল সম্ভাবনা

বাংলাদেশি নার্সদের জন্য বিদেশে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় দুই কোটি ৯০ লাখ নার্স কাজ করছেন। তারপরও ২০৩০ সালের মধ্যে নার্সের ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৫ লাখে। এই বিপুল চাহিদা পূরণে ফিলিপাইন, ভারত ও পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যেই বড় সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশও চাইলে এই বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, ভাষাগত দক্ষতার অভাব, আন্তর্জাতিক মানের পাঠ্যক্রমের ঘাটতি এবং কাঠামোগত জটিলতার কারণে বাংলাদেশি নার্সদের বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হতে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। কানাডায় নিবন্ধিত নার্স মোনসেফা আক্তার বলেন, “বাংলাদেশে পড়াশোনার তুলনায় এখানে এসে মনে হয়েছে আমি নার্সিংয়ের কিছুই জানি না। আবার নতুন করে পড়তে হয়েছে।” তার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে নার্স হিসেবে কাজ করা কঠিন।

বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ড. মো. শরিফুল ইসলাম মনে করেন, ব্রিটিশ আমলের পুরনো নার্সিং শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে আর চলবে না। তার মতে, আন্তর্জাতিক কারিকুলাম চালু করে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে পাঠ্যসূচির ৭০ শতাংশ তত্ত্বভিত্তিক, অথচ হওয়া উচিত ছিল ৭০ শতাংশ প্র্যাকটিক্যাল।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যেমন বিশেষায়িত নার্সের চাহিদা রয়েছে, যেমন- আইসিইউ নার্স, ওটি নার্স বা ক্লিনিক্যাল সাইডে দক্ষ জনবল; বাংলাদেশে সেই দিকটিতে যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়নি। জাপানে পোস্ট ডক্টোরাল ফেলোশিপে থাকা সিনিয়র স্টাফ নার্স ড. মো. নাহিদ উজ জামান বলেন, “আমরা সবাই জেনারেল নার্স। অথচ বিশ্বে স্পেশালাইজড নার্সের চাহিদা বেশি। যদি আমরা সেই জায়গায় ফোকাস করি, তাহলে বাংলাদেশের জন্য বড় বাজার তৈরি হবে।”

বাংলাদেশে নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটের সংখ্যা গত ১৬ বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬৪টিতে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় নার্সের সংখ্যা এখনো অপ্রতুল। চিকিৎসক বনাম নার্সের অনুপাত যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হওয়া উচিত ১:৩, সেখানে বাংলাদেশে আছে মাত্র ১.১:১। প্রতি ১০ হাজার রোগীর জন্য বাংলাদেশে নার্স আছেন ৬.৬ জন, অথচ নেপালে ৪০.৯ জন এবং মালদ্বীপে ৫০.২ জন।

এই ঘাটতির কারণে দেশে যেমন নার্সের প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না, তেমনি বিদেশে দক্ষ জনবল পাঠানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে। সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধার অভাবও নার্সিং পেশায় আগ্রহ কমিয়ে দেয়। সরকারি চাকরিতে নার্সদের প্রাথমিক বেতন শুরু হয় ১০ম গ্রেড থেকে, যা দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি হিসেবে বিবেচিত। অথচ উন্নত বিশ্বে নার্সিং প্রথম শ্রেণির চাকরি হিসেবে স্বীকৃত।

কানাডায় কর্মরত মোনসেফা আক্তার বলেন, “বাংলাদেশে নার্স হিসেবে সেই সম্মানটা ছিল না। কিন্তু এখানে ডাক্তারদের সঙ্গে আমরা কলিগ হিসেবে কাজ করি, সবাই সবাইকে সম্মান করে।” তার অভিজ্ঞতা দেখায়, বিদেশে নার্সিং শুধু আর্থিকভাবে লাভজনক নয়, সামাজিক মর্যাদাও অনেক বেশি।

নার্সিং শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিদেশে যাওয়ার প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। আয়াত কলেজ অব নার্সিং-এর শিক্ষার্থী সূচনা তেরেজা গোস্তা পড়াশোনা শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান। তার মতে, সেখানে চাকরির নিরাপত্তা ও নিয়মকানুন অনেক বেশি। একই কলেজের শিক্ষার্থী সুরাইয়া জাহানও উচ্চতর শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যেতে চান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশি নার্সরা দেশের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি বিদেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। এজন্য সরকারি উদ্যোগ ও পরিকল্পনা জরুরি। ড. শরিফুল ইসলাম বলেন, “নার্সিং স্বাস্থ্য খাতের বড় ওয়ার্কফোর্স। এদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে দেশের চাহিদা পূরণ করেও বিদেশে নার্স পাঠানো সম্ভব।”

বিশ্ববাজারে নার্সের চাহিদা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, ভাষাগত দক্ষতা, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং সরকারি পরিকল্পনা অপরিহার্য।

Logo