বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে অভিবাসনের ধরনও। আগে বাংলাদেশে অভিবাসন মানেই ছিল বিদেশে গিয়ে কাজ করা এবং রেমিট্যান্স পাঠানো। কিন্তু এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরে বসেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে ‘ভার্চুয়াল মাইগ্রেশন’। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন শিকদার ডেইলি স্টারে প্রকাশিত তার এর কলামে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
প্রকাশিত কলামে তিনি বলেছেন, ভার্চুয়াল মাইগ্রেশনের ধারণা প্রথম ব্যাখ্যা করেছিলেন সমাজবিজ্ঞানী অনীশ অনীশ। তার মতে, কাজ সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু কর্মী নিজ দেশে থেকেই তা সম্পন্ন করেন। বিশ্বব্যাংকের Working Without Borders (২০২৩) এবং আইএলও’র Digital Labour Platforms in Kenya (২০২৪) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মহামারির সময় অফিস বন্ধ থাকলেও কাজ চলেছে অনলাইনে। কোটি কোটি মানুষ ঘরে বসে কাজ করেছেন। আইএলওর COVID-19 and the World of Work প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ২.৭ বিলিয়ন শ্রমিক লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোম্পানিগুলো দূরবর্তী কাজের পথ খুঁজে নেয়। এর ফলে “ওয়ার্ক ফ্রম হোম” নিয়মিত ব্যবস্থায় পরিণত হয় এবং বিদেশে না গিয়েও বৈশ্বিক চাকরির সুযোগ তৈরি হয়।
ভারতে আগে দক্ষ তরুণরা বিদেশে চলে যেতেন। এখন অনেকেই দেশে থেকেই সফটওয়্যার, এআই ও ডেটা বিশ্লেষণের কাজ করছেন। গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ১২.৭ শতাংশ কর্মী পুরোপুরি ঘরে বসে কাজ করেন। ফলে ব্রেইন ড্রেইন কমছে।
ফিলিপাইনে ১৫ লাখের বেশি মানুষ অনলাইন চাকরিতে যুক্ত। আইটি-বিপিও খাত বছরে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার আয় করছে। আগে অনেক নারী গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে যেতেন, এখন তারা ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা কাস্টমার সাপোর্ট হিসেবে ঘরে বসে কাজ করছেন।
রোমানিয়ায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অনেক তরুণ দেশে থেকে অনলাইনে বিদেশি কোম্পানির হয়ে কাজ করছেন। গবেষণা বলছে, প্রায় ৪৬ শতাংশ কাজ ঘরে বসে করা সম্ভব।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে অস্থিরতার কারণে বিদেশে কাজের সুযোগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় ভার্চুয়াল মাইগ্রেশন বাংলাদেশের জন্য সময়োপযোগী বিকল্প। এতে বিদেশে না গিয়ে আয় করা যায়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয় না এবং যুদ্ধ বা নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশি তরুণরা গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সার্ভিস, অনলাইন টিচিং, মেডিকেল সাপোর্ট, অ্যাকাউন্টিং ও আইটি সাপোর্টের মতো কাজ করতে পারেন। ইংরেজি ছাড়াও জার্মান ও রুশ ভাষা শেখা ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার বাজারে সুযোগ বাড়াবে।
বাংলাদেশে গ্রামীণ তরুণ, নারী, ফেরত প্রবাসী ও বেকার স্নাতকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ চালু করা জরুরি। সরকার চাইলে একটি জাতীয় ডিজিটাল জব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে, যেখানে দক্ষতা নিবন্ধন করে বৈশ্বিক চাকরির সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাবে।
বর্তমানে ভার্চুয়াল মাইগ্রেশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাই নীতি, আইন ও সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। আইসিটি, প্রবাসী কল্যাণ, শিক্ষা ও শ্রম মন্ত্রণালয়কে এক ছাতার নিচে এনে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে ভার্চুয়াল মাইগ্রেশন বাংলাদেশের নতুন শ্রম রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।
logo-1-1740906910.png)