ছবি - এআই দিয়ে বানানো
মধ্যপ্রাচ্যের যে শহরগুলো একসময় ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের রুটি-রুজির নিশ্চিন্ত আশ্রয়। চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতায় সেগুলো আজ রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। কাতার, কুয়েত কিংবা লেবানন; মানচিত্রে নাম আলাদা হলেও প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্দশার চিত্র এখন সর্বত্র একই।
প্রায় ৯ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। তাদের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক। মাথার ওপর ড্রোন আর মিসাইলের গর্জন, আর পায়ের নিচে কর্মসংস্থানের ভঙ্গুর মাটি; এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়ে আসা এই মানুষগুলো এখন বিদেশের মাটিতে প্রাণ হাতে নিয়ে কাটাচ্ছেন দিন।
কাতারে প্রায় সাড়ে চার লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। নির্মাণ ও সেবা খাতে নিয়োজিত এসব শ্রমিক এখন কঠোর সরকারি বিধিনিষেধের কারণে বিপাকে পড়েছেন। রাজধানীর মুশরিবসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন ‘ফ্রি ভিসায়’ আসা শ্রমিকরা। কাজ বন্ধ, আয় নেই, আর বাজারে নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাতার এয়ারওয়েজের উচ্চ ভাড়া ও পাসপোর্ট নবায়নের জটিলতা, ফলে দেশে ফেরার পথও অনেকের জন্য রুদ্ধ হয়ে গেছে।
কুয়েতেও প্রায় সাড়ে তিন লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। যুদ্ধ আতঙ্কে দেশটির জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে স্থবিরতা নেমে আসায় প্রবাসীরা চাকরির স্থায়িত্ব নিয়ে চরম শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। বিমানে যাতায়াত সীমিত হওয়ায় অনেকেই দেশে ফিরতে পারছেন না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত এই অঞ্চলের রেমিট্যান্স প্রবাহ এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।
সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে লেবাননে। ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত হামলায় দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ১৩০০ ছাড়িয়েছে এবং ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সেখানে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি অবস্থান করছেন, যাদের অনেকেই অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননের হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কর্মরত প্রবাসীরা প্রতিনিয়ত বোমাবর্ষণের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অর্থনৈতিক মন্দা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসার হারও তলানিতে ঠেকেছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, এই দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্সই পাঠাচ্ছেন না, বরং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অথচ বর্তমান সংকটে নিরাপত্তা শঙ্কা, অর্থনৈতিক চাপ এবং মানবিক দুর্ভোগের সবচেয়ে ভারী বোঝা বইতে হচ্ছে এই শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীকেই।
নিজ ভূমিতে ফেরার আকুতি আর প্রবাসে টিকে থাকার অসম লড়াইয়ে তারা আজ বড়ই অসহায় হয়ে পড়েছেন। বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরানো এই মানুষগুলোর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
logo-1-1740906910.png)