Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

অভিবাসনের অধিকার বনাম পাচারের ফাঁদ

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৯

অভিবাসনের অধিকার বনাম পাচারের ফাঁদ

বিগত মার্চ মাসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টায় ১৮ জন বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্বজুড়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। এর ফলে আবারো বিপজ্জনক অভিবাসন প্রক্রিয়া আলোচনায় এনেছে। অপার সৌন্দর্যের ভূমধ্যসাগর যেন আজ বাংলাদেশিদের স্বপ্নের সমাধিতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টায় ২৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যাও কম নয়।  

উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক শশাঙ্ক সাদী দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, অভিবাসন একটি মানবিক অধিকার হলেও মানব পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। অভিবাসন মানুষের সচেতন সিদ্ধান্তের ফল, আর পাচার গড়ে ওঠে প্রতারণা, প্রলোভন ও জবরদস্তির ওপর। উন্নত দেশে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী অভিবাসনের পথ সীমিত হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ পাচারের ফাঁদে পড়ে যায়। অনেকেই বিপুল অর্থ দিয়ে দালালদের কাছে প্রতারিত হয়ে বিপজ্জনক পথে যাত্রা শুরু করে। যারা বেঁচে গিয়ে গন্তব্যে পৌঁছায়, তাদেরও প্রায়ই ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে দেখা হয়, অথচ তারা পাচারকারীদের অমানবিক ব্যবস্থার শিকার।  

সে নিবন্ধে বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের মূল কারণগুলো যা চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক চাপ। নদীভাঙনে ভোলা, শরীয়তপুর, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রামের মানুষ রাতারাতি ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তারা শহরে আশ্রয় খুঁজে নতুন জীবনের চেষ্টা করে। এই পরিস্থিতিতে অভিবাসন হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার কৌশল। দালালরা তাদের সামনে ইউরোপ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। ফলে পরিবারগুলো ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে এবং আর ফিরে আসার পথ থাকে না।  

গবেষক শশাঙ্ক বলেছেন, মানব পাচার রোধে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ ২০২৫’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এতে পাচার-ভুক্তভোগীদের অপরাধী হিসেবে গণ্য না করার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু আইন যথেষ্ট নয়। হাজার হাজার মামলা আদালতে আটকে আছে এবং দণ্ডপ্রাপ্তির হার খুবই কম।  

তিনি আরো বলছেন, কার্যকর প্রতিরোধে জলবায়ু সহনশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ জরুরি। ভুক্তভোগীদের মর্যাদাপূর্ণ আচরণ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু স্থানীয় দালাল নয়, আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা ছাড়া মানব পাচার প্রতিরোধ সম্ভব নয়।  

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে প্রয়োজন অভিবাসন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা। শহরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংস্থা থেকে গ্রামের দালাল পর্যন্ত সবাইকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। নীতি ও বাস্তবতার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা যেন আর সুযোগ নিতে না পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।  

শশাঙ্ক সাদী মনে করেন, শক্তিশালী বাংলাদেশ মানে হবে এমন এক দেশ যেখানে অভিবাসন হবে একটি পছন্দ, শেষ অবলম্বন নয়। মানুষ হতাশা থেকে নয়, বরং আশা থেকে সুযোগ খুঁজবে এবং নিরাপদ অভিবাসনের মাধ্যমে নিজেদের ও দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখবে।

Logo