আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। প্রতি বছর লাখো মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যান। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখের বেশি অভিবাসীর মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। একই বছরে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যার প্রায় অর্ধেক এসেছে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের দেশগুলো থেকে। এতে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতি কতটা এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।
দৈনিক প্রথম আলোর বিশেষজ্ঞ কলামে গবেষক মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন শিকদার জানিয়েছেন, ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরি, নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অভিবাসন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। সংকটের সময় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, ফলে অভিবাসী শ্রমিকদের গুরুত্ব কমে যায়। অনেক সময় হঠাৎ নিয়ম বদলে যায়, শ্রমিকদের চাকরি হারাতে হয় বা দেশে ফিরতে হয়।
অভিবাসী শ্রমিকদের অবস্থান আরো দুর্বল হয়ে পড়ে কাফালা ব্যবস্থার কারণে, যেখানে নিয়োগকর্তার ইচ্ছার ওপর তাদের বৈধতা নির্ভর করে। সংকটকালে শোষণ ও বৈষম্য বাড়ে। করোনা মহামারির সময় যেমন অভিবাসীদের ভাইরাস ছড়ানোর দায়ে আটক বা ফেরত পাঠানো হয়েছিল, তেমনি বর্তমান ইরান যুদ্ধেও অনেক শ্রমিককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার অভিযোগে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
এই যুদ্ধের প্রভাব শ্রমবাজারেও পড়ছে। তেল ও গ্যাস খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর আয় কমছে, বড় প্রকল্পগুলো পিছিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর অধীনে ‘নিওম’ নগরী, ‘রেড সি’ পর্যটন প্রকল্প কিংবা ‘কিদ্দিয়া’ বিনোদন শহরের মতো উদ্যোগগুলোতে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের আশা ছিল। কিন্তু অস্থিরতা চলতে থাকলে এসব প্রকল্প বিলম্বিত বা ছোট হয়ে যেতে পারে। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনেও বিনিয়োগ কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে কাঠামোগত পরিবর্তনও ঘটছে। উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমেই অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। এতে কম দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমে যাবে এবং স্থানীয় নাগরিকদের চাকরিতে অগ্রাধিকার দিতে জাতীয়করণ নীতি আরো জোরদার হবে। ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে, রেমিট্যান্স কমতে পারে এবং অনেক শ্রমিক সঞ্চয় ছাড়াই দেশে ফিরতে বাধ্য হবেন।
তবে এই সংকট নতুন সুযোগও তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে হবে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
এ জন্য অভিবাসন কূটনীতি আরো শক্তিশালী করতে হবে। ভবিষ্যতের চুক্তিতে সংকটকালে সুরক্ষার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যেমন- উদ্ধার সহায়তা, ক্ষতিপূরণ, আইনি সুরক্ষা এবং জরুরি সময়ে ভিসা নবায়ন ফি মওকুফ। পাশাপাশি আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো চিহ্নিত করে সময়মতো নীতি পরিবর্তন করা যায়।
বাংলাদেশকে দক্ষতা ও ভাষাভিত্তিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করতে হবে। রুশ, জার্মান, চীনা, কোরিয়ান ও জাপানি ভাষায় প্রশিক্ষণ দিলে নতুন বাজারে প্রবেশ সহজ হবে। বিদেশি প্রশিক্ষক আনা বা প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনলাইনে যুক্ত করে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিক করা যেতে পারে। এতে দালালের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং অভিবাসন আরো নিরাপদ হবে।
একই সঙ্গে ভার্চুয়াল অভিবাসনের সুযোগও কাজে লাগানো যেতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দেশেই বসে বিদেশি নিয়োগকর্তাদের জন্য কাজ করলে ভিসা বা সীমান্তের ওপর নির্ভর করতে হবে না। আইটি সেবা, ফ্রিল্যান্সিং ও দূরবর্তী কাজের মাধ্যমে স্থিতিশীল আয় সম্ভব হবে।
logo-1-1740906910.png)