বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার জোগানই বাড়ায় না, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট আবারো দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার কতটা একমুখী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট অনিয়মিত হয়ে পড়া, কর্মীদের যাতায়াতে বাধা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চের প্রথম ১০ দিনে বিদেশে যেতে ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কয়েক শ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফলে অনেক কর্মী বিদেশে যেতে পারছেন না, আবার ছুটিতে দেশে এসে অনেকেই আটকা পড়েছেন।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা। গত বছর বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর ৬৭ শতাংশই গেছেন সৌদি আরবে। সামগ্রিকভাবে প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। কর্মী পাঠানোর তালিকায় যদিও ১৬৮টি দেশের নাম রয়েছে, বাস্তবে বড় বাজার তৈরি হয়েছে হাতেগোনা কয়েকটিতে। ফলে ওই অঞ্চলগুলোতে কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারও সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতি তার বাস্তব উদাহরণ। মধ্যপ্রাচ্যে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তাদের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং আয় সবই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে। ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর এসেছে। সরকার যুদ্ধকবলিত প্রবাসীদের সহায়তায় হটলাইন ও নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছে এবং আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরো সক্রিয় ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এ সংকট আরেকটি বিষয়ও সামনে এনেছে, বাংলাদেশ এখনো পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারেনি। ইউরোপ, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সম্ভাবনাময় বাজারে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা থাকলেও সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। কারণ এসব দেশে কাজের জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও ভাষাজ্ঞান। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারও ২০২৪ সালের জুন থেকে বন্ধ রয়েছে নানা অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে। এটি আবারও প্রমাণ করে যে শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা।
নিয়মিত অভিবাসনের পথ সংকুচিত হলে অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে অনেকেই বিপজ্জনক পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছেন। রাশিয়ার মতো নতুন বাজার নিয়েও কিছু অসাধু চক্র সক্রিয় হয়েছে, যারা ভালো বেতন বা নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে কর্মী সংগ্রহ করছে। এসব ঝুঁকি প্রতিরোধে সরকারের নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ সরকার ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার তৈরির চুক্তি করেছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তব ফল দিতে হলে দক্ষ কর্মী তৈরিতে বড় পরিসরে বিনিয়োগ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, ভাষা প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর না দিলে বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি করা সম্ভব হবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট বাংলাদেশের জন্য এক সতর্কবার্তা। বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে টেকসই করতে হলে একক অঞ্চলনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বহুমুখী শ্রমবাজার গড়ে তোলা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা ছাড়া আর কোনো বাস্তবসম্মত পথ নেই। এখনই সেই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
logo-1-1740906910.png)