মানব পাচারের শিকার হয়ে লিবিয়ায় বন্দি অবস্থায় আছেন বরিশালের অর্ধশতাধিক যুবক। কারাে খোঁজ মিলেছে, কেউবা এখনো নিখোঁজ। তাদের নিয়ে খবর প্রকাশ হয়েছে দৈনিক কালের কণ্ঠ
দৈনিকটির বরিশাল প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, তাদের সবার ইতালি যাওয়ার কথা ছিল। কাজের ভিসার আশ্বাসও মিলেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সৌদি আরব, মিসর ঘুরে এক রাতে চোখ বেঁধে নামিয়ে দেওয়া হয় অচেনা এক দেশে।
সেটি ইতালি নয়, লিবিয়া। বরিশালের আগৈলঝাড়া ও গৌরনদীর অন্তত অর্ধশতাধিক যুবক এখন লিবিয়ায় বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। কারো সন্ধান মিলেছে, অনেকেই এখনো নিখোঁজ। দুই উপজেলার বহু পরিবার একই প্রশ্নে রাত জাগছে, ছেলেটা বেঁচে আছে তো?
চলতি বছরের দুই মাসে মুক্তিপণ দিয়ে লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন ২০ যুবক।
তাদের বেশির ভাগই আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে তিনটি মানব পাচার মামলা হয়েছে। তিনটি মামলায় আসামি করা হয়েছে গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ডুমুরিয়া গ্রামের মৃত আইউব আলীর ছেলে জামাল মোল্লা (৫০), তার ইতালিপ্রবাসী দুই ছেলে জাকির মোল্লা (৩৫) ও সাকিব মোল্লা (৩৩)। পাশাপাশি জামাল মোল্লার দুই শ্যালক পূর্ব ডুমুরিয়া গ্রামের মৃত বুদাই বেপারীর ছেলে বাবুল বেপারী (৪৫) এবং হাবুল বেপারী ওরফে হাবুল মেম্বারের (৪২) নামও মামলায় রয়েছে।
জামাল মোল্লা ও তার এক শ্যালক বাবুল বেপারী বর্তমানে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে। অপর শ্যালক হাবুল মেম্বার পলাতক। জামালের দুই ছেলে বিদেশে থাকায় তদন্তের গতি শ্লথ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, দালাল, ব্যাংক লেনদেন, ভিডিও কলের আশ্বাস আর শেষে ভূমধ্যসাগরের পথে ভয়ংকর যাত্রা। প্রতিটি ঘটনায় চেনা একই চিত্র।
আগৈলঝাড়ার রাজিহার ইউনিয়নের ছোট ডুমুরিয়া গ্রামের মেহেদী হাসান খান। অভিযোগের ভাষা সংক্ষিপ্ত, অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। তার ভাষ্য, জামাল মোল্লা পরিবারকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ১৬ লাখ টাকা দিলে ইতালিতে থাকা তার দুই ছেলের মাধ্যমে বৈধভাবে কাজের ব্যবস্থা হবে। প্রথমে নগদ, পরে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হয়। ভিডিও কলে বিদেশে থাকা ছেলেদের দেখানো হয়। মেহেদীর বিশ্বাস জন্মায়। জমি বিক্রি করে, ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করেন মেহেদী। এক সকালে বলা হয়, ‘আজই ঢাকা যেতে হবে।’
গত বছরের ২৬ আগস্ট ইতালির উদ্দেশে দেশ ছাড়েন মেহেদী। কয়েক দিনের মধ্যেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে জানা যায়, তাকে প্রথমে সৌদি আরব, এরপর মিসর হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। এক পর্যায়ে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পাঠানো হয় বেনগাজির একটি কারাগারে।
কারাগার থেকে অন্যের মোবাইলে ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। কাঁপা গলায় নিজের অবস্থার কথা জানান মেহেদী। তখনই নতুন শর্ত, আট লাখ টাকা মুক্তিপণ। পরিবার আবার ধার করে, শেষ সম্বল বিক্রি করে টাকা পাঠায়। ৪ জানুয়ারি দেশে ফেরেন মেহেদী। সঙ্গে ভেঙে পড়া শরীর আর আতঙ্ক। দেশে ফিরে জানতে পারেন, তিনি একা নন, আরো অনেকে নিখোঁজ।
গৌরনদীতেও একই চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। কোথাও ২৪ লাখ, কোথাও ২৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ। প্রতিটি মামলাতেই একই নাম ঘুরে ফিরে এসেছে, জামাল মোল্লা তার দুই শ্যালক এবং বিদেশে থাকা দুই ছেলে। মামলার নথি বলছে, শুধু গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া মিলিয়ে অন্তত ১০৮ জন যুবক এই নেটওয়ার্কের ফাঁদে পড়েছেন।
logo-1-1740906910.png)