২০২৩ সালে যখন মুক্তা আক্তার সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখন তার হাতে কোনো সঞ্চয় ছিল না, ছিল না কোনো মালপত্র। রিক্ত হাতে ফেরা এই নারীকে নিজের গ্রাম শরীয়তপুরে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল অপবাদ আর গঞ্জনা দিয়ে। বিদেশের মাটিতে নিয়োগকর্তার অনৈতিক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে লড়েছেন, অসুস্থ শরীরে না খেয়ে কাজ করেছেন; কিন্তু দেশে ফিরে সমাজ তাকে দেখিয়েছিল কেবল ঘৃণা। সেই মুক্তাই সম্প্রতি ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের উজ্জ্বল আলোয় দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের করতালির মাঝে গ্রহণ করলেন ‘শ্রেষ্ঠ জয়ী’ পুরস্কার। ঢাকা বিভাগের ১৩টি জেলার হাজারো নারীকে পেছনে ফেলে তিনি ‘নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা’ ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরেছেন।
মুক্তার এই উত্তরণ কেবল বেঁচে থাকার গল্প নয়, এটি মানুষের অদম্য প্রাণশক্তির এক অনন্য পাঠ। দুই সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় এক দালালের খপ্পরে পড়ে ৩০ হাজার টাকা বেতনের আশায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। ধার করা ৬৫ হাজার টাকা শোধ করার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমানো সেই দেশই তার জন্য নরক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে শারীরিক নির্যাতন, অভুক্ত থাকা এবং অবর্ণনীয় কষ্টের পর খালি হাতে দেশে ফিরে মুক্তা যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই তার পাশে দাঁড়ায় উইনরক ইন্টারন্যাশনালের ‘আশ্বাস’ (Ashshash) প্রকল্প। শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (এসডিএস) মাধ্যমে তাকে প্রথমে নিবিড় মানসিক ও সামাজিক কাউন্সেলিং প্রদান করা হয়, যা তাকে বিষণ্ণতা কাটিয়ে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়।
আশ্বাস প্রকল্পের সহায়তায় মুক্তা উদ্যোক্তা হওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং কাপড়ের ব্যবসা ও গবাদি পশু পালনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র পরিসরে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন। যে গ্রামে তাকে একসময় বাঁকা চোখে দেখা হতো, আজ সেখানেই তিনি মানসম্মত পোশাকের এক সফল ব্যবসায়ী। তিনি এখন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এবং একাই তার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করছেন। তবে মুক্তার গল্পের সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায় হলো তার ‘সারভাইভার লিডার’ বা নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ। তিনি তার উপজেলায় ৫০০-এর বেশি মানুষকে নিরাপদ অভিবাসন এবং পাচার প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করেছেন।
পুরস্কার গ্রহণের সময় মুক্তা এক শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমি আমার গল্পটি সবাইকে শোনাই, যাতে অন্য কাউকে এই বিভীষিকার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” পুরস্কার জয়ের পর যখন তিনি বিজয়ীর বেশে শরীয়তপুরে ফিরেছেন, তখন তার সাথে ছিল বাংলাদেশের প্রত্যেক নারীর জন্য এক শক্তিশালী বার্তা— “তোমার অতীত হয়তো একটি অধ্যায় মাত্র, কিন্তু পুরো বইটির লেখক তুমি নিজেই।” আশ্বাস প্রকল্পের এই সাফল্য প্রমাণ করে, পাচারের শিকার নারীরা সমাজের বোঝা নন, সঠিক সমর্থন পেলে তারাই হতে পারেন আগামীর সুযোগ্য নেতৃত্ব।
logo-1-1740906910.png)