কেন রেকর্ড রেমিট্যান্সের পরও টাকার মান দুর্বল?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০৭
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স অর্জন করেছে, ৩২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। প্রবাসীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো এবং হুন্ডি ব্যবসার ওপর সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে এই প্রবাহ বেড়েছে।
তবুও সাধারণ মানুষ টাকার দুর্বলতা অনুভব করছে। জ্বালানি, ওষুধ, ভোজ্যতেলসহ আমদানি নির্ভর পণ্যের দাম কমেনি। জীবনযাত্রার ব্যয়ও সহজ হয়নি। এর কারণ হলো রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে সাময়িকভাবে স্থিতিশীল রাখছে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে পারছে না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের সহকারী অধ্যাপক মো. মোমিনুর রহমান দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে এক কলামে এ বিশ্লেষণটি করেছেন।
তার মতে, বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, সার, ওষুধ; সবই বিদেশ থেকে আসে। ফলে রেমিট্যান্সের ডলার দ্রুত আমদানি খাতে ব্যয় হয়ে যায়। অর্থাৎ রেমিট্যান্স প্রবাহ যতই বাড়ুক, তা মুদ্রার মান বাড়াতে যথেষ্ট নয়, কারণ একই সঙ্গে আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে।
রেমিট্যান্সের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে। জানুয়ারির শুরুতে মোট রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ২৮.৫১ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ দিয়ে কয়েক মাসের আমদানি খরচ মেটাতে হয়, ফলে অতিরিক্ত চাপ সামলানোর মতো সঞ্চয় থাকে না।
প্রতিবেদনে তিনি জানান, টাকা দুর্বল হলে দাম দ্রুত বাড়ে, কিন্তু স্থিতিশীল হলে দাম তেমন কমে না। কারণ আমদানি চুক্তি আগেই উচ্চ ডলারে সম্পন্ন হয়, পরিবহন ও জ্বালানি খরচও থেকে যায়। ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায় দাম কমাতে চান না। তাই সাধারণ মানুষ টাকার দুর্বলতা অনুভব করে, যদিও রিজার্ভ কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
আত্মবিশ্বাস ও প্রত্যাশাও মুদ্রার মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। রিজার্ভে চাপ থাকলে আমদানিকারকরা বেশি ডলার চান, ফলে টাকার মান দুর্বল হয়। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও বাজারে আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি।
মো. মোমিনুর রহমান মনে করেন, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যা হলো, রেমিট্যান্স উৎপাদনশীল রপ্তানি আয়ের মতো নয়। রপ্তানি আয় আসে শিল্প ও প্রযুক্তি থেকে, যা অর্থনীতিকে টেকসই শক্তি দেয়। রেমিট্যান্স কেবল ভোগ ও সঞ্চয় বাড়ায়, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায় না। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে, যেখানে রপ্তানি সুবিধা কমে যাবে। তখন রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরতা যথেষ্ট হবে না।
সমাধান হিসেবে এই বিশ্লেষক বলছেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ জরুরি। গার্মেন্টসের বাইরে ওষুধ, ডিজিটাল সেবা, সৃজনশীল শিল্পে জোর দিতে হবে। আমদানি দক্ষতা বাড়াতে জ্বালানি স্বনির্ভরতা ও স্থানীয় সরবরাহ চেইন উন্নত করতে হবে। রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও আস্থা বাড়াতে হবে। আর রেমিট্যান্সকে শুধু ভোগে নয়, উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগাতে হবে।
logo-1-1740906910.png)