Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

ঋণ করে বিদেশযাত্রা: প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় বাজি

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৫

ঋণ করে বিদেশযাত্রা: প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় বাজি

বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রবাস জীবনের শুরুতে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ঋণ। জমি বন্ধক রাখা, এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার কিংবা সুদে টাকা; সব মিলিয়ে বিদেশযাত্রা অনেকের কাছে স্বপ্ন নয়, বরং এক ধরনের বাধ্যতামূলক বাজি। এই বাজিতে সফল হলে পরিবার বদলে যায়, ব্যর্থ হলে শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাসত্বের মতো জীবন। 

বাংলা টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবে বিদেশে যাওয়ার খরচ ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা বলা হলেও বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্যে তা ৬ থেকে ১০ লাখ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৭ থেকে ১২ লাখ এবং ইউরোপ বা লাটিন আমেরিকার রুটে ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকায় পৌঁছে যায়। এত বিপুল অর্থের জোগান আসে মূলত ঋণ থেকেই। ব্যাংকিং সাপোর্ট সীমিত, সরকারি স্বল্পসুদী ঋণ অপ্রতুল এবং রিক্রুটিং বাজার পুরোপুরি বেসরকারি ও অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় বিদেশযাত্রার আগে একজন শ্রমিক হয়ে পড়েন ঋণগ্রস্ত অভিবাসী।

ঋণ প্রবাস জীবনের চরিত্র বদলে দেয়। শ্রমিককে সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়াতে হয়, শোষণ সহ্য করতে হয় এবং ঝুঁকি নিতে হয়। অনেক প্রবাসী বলেন, “কাজ খারাপ হলেও ছাড়তে পারিনি, কারণ দেশে ঋণ অপেক্ষা করছিল।” ঋণগ্রস্ত শ্রমিকরা কম বেতন, অতিরিক্ত কাজ কিংবা চুক্তিভঙ্গের পরও প্রতিবাদ করতে পারেন না। ফলে তাদের শোষণ আরো সহজ হয়ে যায়।  

সবাই কাজ পান না। অনেক সময় ভিসা থাকলেও কাজ থাকে না বা বেতন মেলে না। কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিক রাস্তায় পড়ে যান। ঋণ শোধ তো দূরের কথা, প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। তখন প্রবাস জীবন অর্থনৈতিক ও মানসিক ফাঁদে পরিণত হয়।  

জাতীয় পরিসংখ্যানে রেমিট্যান্সকে গৌরবের গল্প হিসেবে দেখা হলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকে বছরের পর বছর ঋণ শোধের চাপ। প্রথম দুই থেকে তিন বছর অনেক প্রবাসী আসলে পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে পারেন না, বরং ঋণ শোধ করতেই ব্যস্ত থাকেন। এতে সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগত। রিক্রুটিং খরচের লাগাম নেই, প্রবাসী কল্যাণ ঋণ সীমিত ও জটিল, তথ্যের অভাব এবং ভুয়া প্রলোভন; সব মিলিয়ে বিদেশযাত্রা হয়ে উঠছে উচ্চঝুঁকির বিনিয়োগ। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সামাজিক চাপ। অনেকেই বিদেশ যান শুধু পাশের বাড়ির ছেলে গেছে বলে বা না গেলে লজ্জা হবে ভেবে।  

সমাধানের পথ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণভিত্তিক প্রবাস কমাতে হলে সরকার-টু-সরকার চুক্তি বাড়াতে হবে, দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসন নিশ্চিত করতে হবে, ব্যয় স্বচ্ছভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং বিদেশ যাওয়ার আগে প্রশিক্ষণ ও তথ্যসেবা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফেরত আসা প্রবাসীদের অভিজ্ঞতাও নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।  

ঋণ করে বিদেশ যাওয়া ব্যর্থতা নয়, তবে এটিকে একমাত্র পথ বানিয়ে ফেলা ভয়ংকর। তখন মানুষ নয়, ঋণটাই বিদেশ যায়। রাষ্ট্র যদি প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তরিক হয়, তবে নিশ্চিত করতে হবে প্রবাস জীবন হবে সুযোগ, জুয়া নয়।

Logo