বাংলাদেশে জলবায়ু বিপর্যয় ও নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে আশ্রয় নেওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোটার হতে পারছেন না। স্থায়ী ঠিকানা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার হারাচ্ছেন। বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর এ নিয়ে প্রকাশ করেছে বিশেষ প্রতিবেদন।
৬৫ বছর বয়সী জাহানারা বেগম বরিশালের ইলশা বাড়ি এলাকায় জন্মেছিলেন। তিন দশক আগে নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে ঢাকায় আসেন। সেই থেকে আর কোনো নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। স্থায়ী ঠিকানা ও কাগজপত্র না থাকায় ভোটার তালিকায় নাম ওঠেনি। তার প্রশ্ন, “ভোট দিতে পারি না, আবার বয়স্ক ভাতাও পাই না। তাহলে আমি কি এই দেশের নাগরিক না?”
অটোরিকশাচালক জসিম উদ্দিনেরও একই অভিজ্ঞতা। ভোলা থেকে ঢাকায় আসা এই জলবায়ু উদ্বাস্তু ভোটার আইডি থাকলেও ঠিকানা জটিলতায় ভোট দিতে পারছেন না। সন্তানদের জন্মনিবন্ধনও আটকে আছে।
ভোটার হতে গিয়ে অনেকেই পড়ছেন দালালচক্রের ফাঁদে। জাহানারা বেগম বলেন, “নির্বাচন অফিসে গেলে দালালরা বলে তিন হাজার টাকা দিলে এনআইডি করে দেবে।” অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষদের জন্য এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভিটেমাটি হারিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢাকায় আসা তরুণী মিতু আক্তার পড়াশোনা করেছেন ক্লাস পাঁচ পর্যন্ত। বয়স হয়েছে ভোট দেওয়ার, কিন্তু ভোটার হতে পারেননি। ভোটার আইডি না থাকায় এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণ হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সংস্থা আইডিএমসির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দুর্যোগজনিত কারণে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু এখনো নেই কোনো সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ডাটাবেজ।
সিপি এনজিওর অপারেশন ম্যানেজার ফারজানা আলম বলেন, “ঢাকায় আসা ক্লাইমেট মাইগ্রেটদের ভোটার আইডি করানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু বাস্তবে ব্যর্থ হচ্ছি।”
সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামছুদ্দোহা বলেন, “ডাটা ও ডকুমেন্টেশনের অভাবে তারা নিজের দেশেই কার্যত উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের স্বার্থে বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে।”
এনআইডি বিভাগের মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ন কবির বলেন, “কেউ যদি বস্তিতে থাকেন, তাহলে বাড়িওয়ালার স্থায়ী ঠিকানা দিলেই এনআইডি করা সম্ভব।” তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, কাগজের নিয়ম আর জীবনের বাস্তবতার ফাঁকেই ভোটাধিকার হারাচ্ছেন হাজারো মানুষ।
ভিটেমাটি হারিয়ে শহরে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষ কি কেবল ভোটের সময় প্রয়োজন, নাকি নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার দায়ও রাষ্ট্র নেবে?
logo-1-1740906910.png)