Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

সন্তানের মাদকাসক্তি: প্রবাসী পিতা-মাতার দায়িত্বশীলতা জরুরি

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৮

সন্তানের মাদকাসক্তি: প্রবাসী পিতা-মাতার দায়িত্বশীলতা জরুরি

বাংলাদেশে মাদকাসক্তির বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি করা একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ এক বা একাধিক ধরনের মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো ব্যবহারকারীদের বড় অংশ তরুণ এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ১৮ বছর হওয়ার আগেই প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহারকারী ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সে মাদক গ্রহণ শুরু করেছে।  

গবেষণায় মাদক প্রকারভেদ অনুযায়ী দেখা গেছে, গাঁজা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত, প্রায় ৬১ লাখ মানুষ গাঁজা ব্যবহার করে। ইয়াবা বা মেথামফেটামিন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ, অ্যালকোহল ব্যবহারকারী প্রায় ২০ লাখ। এছাড়া কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইনও ব্যবহৃত হচ্ছে। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার; এ ধরনের ব্যবহারকারীরা এইচআইভি ও হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।  

জরিপে গ্রামাঞ্চলেও মাদক গ্রহণ বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। যদিও শহরাঞ্চলে সংখ্যাগতভাবে বেশি ব্যবহারকারী রয়েছে, গ্রামেও দ্রুত বিস্তার ঘটছে। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি। গবেষকরা বলছেন, মাদক গ্রহণের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ এবং অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা চিহ্নিত হয়েছে। জরিপে প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, মাদক তাদের জন্য সহজলভ্য।  

এই পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে নজর দেওয়া দরকার পারিবারিক ভূমিকার ওপর। পরিবার, বিশেষ করে প্রবাসী পিতা-মাতা, যদি সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল না হন- নিয়মিত খোঁজ না রাখেন, যোগাযোগ না রাখেন বা মানসিক সহায়তা না দেন; তবে কিশোররা সহজেই ভুল বন্ধুমহলে পড়ে যেতে পারে। প্রবাসী পিতা-মাতাদের জন্য কয়েকটি কার্যকর পরামর্শ জরুরি: নিয়মিত ফোন বা ভিডিও কলের মাধ্যমে সন্তানের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে খোঁজ রাখা; স্কুল ও শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা; সন্তানকে সময় দেওয়া- শোনা ও বোঝার চেষ্টা করা; বন্ধুমহল ও অনলাইন কার্যকলাপ সম্পর্কে সচেতন থাকা; আর্থিক সহায়তা থাকলে তা নিয়ন্ত্রিতভাবে দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বা কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করা।  

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজকেন্দ্রগুলোরও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে সচেতনতা কর্মসূচি, পিয়ার সাপোর্ট গ্রুপ, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কার্যক্রম কিশোরদের ইতিবাচক দিকগুলোকে জাগিয়ে তুলতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে মিলে পুনর্বাসন কেন্দ্র, সহজলভ্য কাউন্সেলিং সেবা এবং পরিবারভিত্তিক হস্তক্ষেপ বাড়াতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য খাতকে যৌথভাবে জনস্বাস্থ্য দৃষ্টিকোণ থেকে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।  

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক সমস্যা কেবল অপরাধ নয়; এটি একটি জটিল সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে এ বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুবকল্যাণ কর্মসূচি, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রসার এবং প্রবাসী পিতা-মাতাদের জন্য সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করলে কিশোরদের মধ্যে মাদকাসক্তি রোধে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।  

অবশেষে, পরিবারই হলো প্রথম প্রতিরোধ। পিতা-মাতা যদি সন্তানের প্রতি সময় ও মনোযোগ বাড়ান, তাদের উদ্দীপিত ও নিয়োজিত রাখেন, বন্ধুমহল সম্পর্কে খোঁজ রাখেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেন; তবে কিশোরদের মাদকাসক্তির ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকার মিলেই যদি সমন্বিত উদ্যোগ নেয়, তাহলে এই ভয়াবহ প্রবণতাকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে।

Logo