যে তিনটি জেলায় এসেছে অর্ধেকের বেশি রেমিট্যান্স
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১০
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ হাজার ৬২৬ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক আয়। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। তবে এই বিপুল রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি এসেছে মাত্র তিনটি জেলা থেকে। সেগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই তিন জেলায় এসেছে ৮৫৬ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ৫২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষ দশ জেলার মধ্যে ঢাকা রয়েছে একেবারে শীর্ষে। রাজধানী জেলায় এসেছে ৬২৮ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম, যেখানে এসেছে ১৩৯ কোটি ৬১ লাখ ডলার। তৃতীয় স্থানে কুমিল্লা, যেখানে এসেছে ৮৭ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। এরপরের অবস্থানে রয়েছে সিলেট, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, টাঙ্গাইল ও মুন্সীগঞ্জ। এই দশটি জেলা মিলিয়ে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৭১ শতাংশ এসেছে।
অন্যদিকে দেশের কিছু জেলা রেমিট্যান্স আহরণে একেবারেই পিছিয়ে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, রাঙামাটি ও বান্দরবান থেকে এসেছে এক কোটিরও কম বৈদেশিক আয়। সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স এসেছে লালমনিরহাটে, মাত্র ৮২ লাখ ডলার। পঞ্চগড়ে এসেছে ৯২ লাখ, রাঙামাটিতে ৯৪ লাখ এবং বান্দরবানে এসেছে ৯৯ লাখ ডলার। এছাড়া খাগড়াছড়ি, ঠাকুরগাঁও, শেরপুর, নীলফামারী, জয়পুরহাট ও কুড়িগ্রামসহ আরো কয়েকটি জেলায় রেমিট্যান্সের পরিমাণ দুই থেকে তিন কোটি ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সব মিলিয়ে সর্বনিম্ন দশটি জেলা থেকে এসেছে মাত্র ১৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের এক শতাংশেরও কম।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে দুইভাবে প্রবাসী আয় দেশে আসে। একটি হলো সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া। অন্যটি হলো ক্যাশ পিকআপ, যেখানে প্রবাসীর আইডি ও ট্রানজেকশন নম্বর দিয়ে যে কোনো ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করা যায়। ব্যাংকগুলো যে এলাকায় টাকা উত্তোলন হয়, সেটিকে ওই এলাকার রেমিট্যান্স হিসেবে রিপোর্ট করে। ফলে ঢাকায় বেশি মানুষের বসবাস ও নাগরিক সুবিধার কারণে এখানেই সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাও দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থানীয় জেলা হিসেবে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো এলাকার মানুষ একবার বিদেশে যেতে শুরু করলে আশপাশের মানুষও সেই পথে যায়। আবার কিছু এলাকায় বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কম। অনেক জেলার জনসংখ্যা কম হওয়ায় রেমিট্যান্স আহরণেও তারতম্য দেখা যায়। তিনি মনে করেন, সরকারি উদ্যোগে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে জেলা কোটা চালু করা যেতে পারে। যেসব এলাকায় প্রবাসে যাওয়ার প্রবণতা কম, সেখানে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
শীর্ষ দশ জেলার বাইরে আরো ১৭টি জেলা রয়েছে, যেখানে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ১০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজারে এসেছে ২৫ কোটি ৩৪ লাখ, নারায়ণগঞ্জে ২৫ কোটি ৫ লাখ, মাদারীপুরে ২৪ কোটি ৩২ লাখ, লক্ষ্মীপুরে ২৪ কোটি ১২ লাখ, নরসিংদীতে ২৩ কোটি ১৫ লাখ, কিশোরগঞ্জে ২২ কোটি ১৬ লাখ এবং গাজীপুরে ২১ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, যশোর ও বগুড়ায়ও এসেছে ১০ থেকে ১৭ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স।
এরপরের ধাপে রয়েছে আরো ২৮টি জেলা, যেখানে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩ থেকে ৯ কোটি ডলারের মধ্যে। এর মধ্যে কুষ্টিয়া, পাবনা, কক্সবাজার, জামালপুর, খুলনা, গোপালগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, ভোলা, রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, পিরোজপুর, বরগুনা ও নওগাঁ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বাগেরহাট, গাইবান্ধা, রংপুর, পটুয়াখালী, নাটোর, নেত্রকোনা, মাগুরা, দিনাজপুর, ঝালকাঠি ও নড়াইল থেকেও এসেছে কয়েক কোটি ডলারের রেমিট্যান্স।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, দেশের রেমিট্যান্স আয় মূলত কয়েকটি জেলায় কেন্দ্রীভূত। ঢাকাই এককভাবে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৩৯ শতাংশের জোগান দিয়েছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা মিলিয়ে আরো ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের অনেক জেলা রেমিট্যান্স আহরণে একেবারেই পিছিয়ে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই বৈষম্য কমাতে হলে প্রবাসে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে জেলা ভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং সরকারি সহায়তা বাড়ানো গেলে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলো থেকেও বৈদেশিক আয় বাড়ানো সম্ভব হবে।
logo-1-1740906910.png)