Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ডিগ্রি বাড়ছে, দক্ষতা নয়

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১৯

বাংলাদেশে ডিগ্রি বাড়ছে, দক্ষতা নয়

প্রতি বছর বাংলাদেশে কয়েক লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। শতাধিক সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজারো কলেজ ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিগ্রিধারীরা বের হচ্ছেন অনেক আশা নিয়ে। কিন্তু অনেক তরুণের জন্য স্নাতক শেষ করা মানে দীর্ঘ বেকারত্ব বা অপ্রতুল কর্মসংস্থানের শুরু। ইংরেজি সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক কলামে ইউনিলিভার কনস্যুমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলছেন, যুব বেকারত্ব এখন কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে।কারণ তরুণদের যোগ্যতার অভাব নয়, বরং একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যা সার্টিফিকেটকে দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, মুখস্থবিদ্যাকে বাস্তব দক্ষতার ওপর প্রাধান্য দেয়।  

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম বিচ্ছিন্ন কাঠামো। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা, ইবতেদায়ি, টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ধারাগুলো আলাদা আলাদা চলছে, কিন্তু সমন্বিত কোনো জাতীয় কাঠামো নেই। নীতিমালা বারবার রাজনৈতিক মতাদর্শ বা স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য অনুযায়ী বদলেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা সমমানের ডিগ্রি পেলেও দক্ষতায় ব্যাপক পার্থক্য থেকে যায়। এতে নিয়োগদাতারা বিভ্রান্ত হন, আর গ্র্যাজুয়েটরা কর্মক্ষেত্রে অপ্রস্তুত থাকেন।  

প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বই মুখস্থ করতে শেখানো হয়। পরীক্ষায় ভালো নম্বরই সাফল্যের মাপকাঠি, সমালোচনামূলক চিন্তা, যোগাযোগ দক্ষতা বা বাস্তব প্রয়োগ নয়। ফলে অনেক গ্র্যাজুয়েট পরীক্ষায় ভালো করলেও কর্মক্ষেত্রে সাধারণ কাজ- যেমন ইমেইল লেখা, প্রেজেন্টেশন দেওয়া, সমস্যা বিশ্লেষণ বা দলগতভাবে কাজ করা; করতে হিমশিম খান।  

শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষকের ওপর। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষকতা ধীরে ধীরে পেশাগত মর্যাদা হারিয়েছে। কম বেতন, সীমিত প্রশিক্ষণ, দুর্বল জবাবদিহি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। গ্রামীণ স্কুলে অনুপস্থিতি ও পুরোনো শিক্ষণপদ্ধতি সাধারণ। সরকার আইসিটি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করলেও অনেক স্কুলে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহার হয় না। অনেক শিক্ষক প্রযুক্তি ব্যবহারে অনিশ্চিত, ফলে শিক্ষার্থীদেরও নিরুৎসাহিত করা হয়।  

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তত্ত্ব ও লিখিত পরীক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ সীমিত। সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা নির্মাণের মৌলিক বিষয় জানেন না, মেকানিক্যাল বা ইলেকট্রিক্যাল গ্র্যাজুয়েটরা সাধারণ মেরামতেও সমস্যায় পড়েন। ব্যবসা, ব্যবস্থাপনা ও আইটি শিক্ষায়ও একই দুর্বলতা দেখা যায়। ফলে নিয়োগদাতাদের পুনঃপ্রশিক্ষণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়।  

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণ মান কমিয়েছে। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লাভকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, ভর্তি বাড়ানোই মূল লক্ষ্য। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণার অভাবে মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ভোকেশনাল শিক্ষায় সামাজিক কলঙ্ক এখনো বিদ্যমান। পুরোনো যন্ত্রপাতি, দুর্বল শিল্পসংযোগ ও দুর্নীতির কারণে টেকনিক্যাল শিক্ষার মান কম। অথচ শিল্পক্ষেত্রে দক্ষ টেকনিশিয়ান ও মাঝারি স্তরের পেশাজীবীর ঘাটতি রয়েছে।   

সমাধান হলো আরো বেশি গ্র্যাজুয়েট তৈরি নয়, বরং দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা। পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন থেকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় যেতে হবে। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও প্রকল্প কাজ বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, ন্যায্য বেতন ও প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া জরুরি। আইসিটি প্রতিদিনের শিক্ষার অংশ হতে হবে।  

বাংলাদেশের যুব বেকারত্ব তরুণদের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি ব্যর্থ সিস্টেমের ফল। যতদিন না শিক্ষা বাস্তব দক্ষতা, অভিযোজন ক্ষমতা ও কর্মক্ষেত্রের প্রাসঙ্গিকতায় রূপান্তরিত হচ্ছে, ততদিন ডিগ্রি বাড়বে কিন্তু সুযোগ সীমিতই থাকবে। সৎ ও ধারাবাহিক সংস্কার হলে তরুণ জনগোষ্ঠীই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

Logo