সমাজে প্রবাসী পুরুষদের অবদান যতটা স্বীকৃতি পায়, প্রবাসী নারীদের ক্ষেত্রে তা এখনো খুব সীমিত। অথচ প্রতি বছর এক লাখেরও বেশি নারী বিভিন্ন পেশায় কাজ করতে বিদেশে যান। অর্থনীতি ও সমাজে তাদের অবদান থাকা সত্ত্বেও সেই ত্যাগের মূল্যায়ন যথাযথভাবে হয় না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক লাবনী আক্তার শিমলা দৈনিক সমকাল পত্রিকায় লেখা তার এক নিবন্ধে এসব কথা বলেন।
মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ নানা দেশে প্রবাসী নারীরা কঠিন ও অনিশ্চিত কর্মপরিবেশে জীবনযাপন করেন। গৃহকর্মী, রাঁধুনি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কেয়ারগিভার, নার্স, পোশাক শ্রমিক, রেস্টুরেন্টে ওয়েট্রেস বা কিচেন হেলপার; বিভিন্ন পেশায় তাদের কাজ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দিনে ১০ ঘণ্টার বেশি শ্রম দিতে হয়। অসুস্থ হলেও ছুটি বা বিশ্রাম মেলে না- এমন অভিযোগও আছে।
বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নারীদের কর্মজীবন বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। দরিদ্র পরিবারের অনেক নারী অভাবের তাড়না, অনিয়মিত বেতন, পারিবারিক কলহ, নির্যাতন কিংবা স্বনির্ভরতার আশায় প্রবাসজীবন বেছে নেন। পরিবার থেকে দূরে, নিরাপত্তাহীন পরিবেশে থেকেও তারা শারীরিক ও মানসিক চাপ সহ্য করেন। তবুও নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে যান। অনেক সময় পরিবারও জানে না, তারা কতটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
বাংলাদেশে বহু পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রবাসী নারীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী নারীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের মোট রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ।
তবুও সমাজে প্রবাসী নারীরা অবহেলিতই থেকে যান। তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের উদ্যোগ এখনো অপর্যাপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি নীতিমালার সীমাবদ্ধতা ও দূতাবাসগুলোর কার্যকারিতার অভাব অনেক সময় সুরক্ষা নিশ্চিত করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চুক্তিভঙ্গ, বেতন না পাওয়া কিংবা নির্যাতনের অভিজ্ঞতা অন্য নারীদেরও প্রবাসে যেতে নিরুৎসাহিত করছে।
প্রবাসী নারীদের অধিকার রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। আলাদা হটলাইন, আইনি সহায়তা, নিয়মিত মনিটরিংয়ের জন্য দূতাবাসে বিশেষ কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ন্যায্য বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা দরকার।
পরিবার ও সমাজেরও দায়িত্ব আছে। প্রবাসী নারীদের ত্যাগের স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান জানাতে হবে। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু অর্থ নয়, দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। নীরব এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদানকে সম্মান ও গুরুত্ব দিয়ে দেখার সময় এখনই।
logo-1-1740906910.png)