বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গে গভীর উদ্বেগ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৩২
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনায় সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে উদ্বেগ বাড়ছে। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত এপার বাংলার বিশিষ্টজনরা এসব ঘটনাকে নিন্দনীয় ও ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছেন। জার্মানভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ডয়েচে ভেলে এ নিয়ে প্রকাশ করেছে এক বিশেষ প্রতিবেদন।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রণী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটে ১৮ ডিসেম্বর রাতে হামলার ঘটনা ঘটে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটিতে হামলায় ভেঙে ফেলা হয় একাধিক বাদ্যযন্ত্র। নষ্ট করা হয় ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত শিল্পী সনজীদা খাতুনের প্রতিকৃতি।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সংগীতশিল্পী কবীর সুমন বলেন, যা ঘটেছে তা নিষ্ঠুরতার প্রকাশ। তার ভাষায়, বারবারই নির্বুদ্ধিতা ও মূর্খতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে, যা সমাজের জন্য লজ্জাজনক ও ভয়ংকর।
নজরুল বিশেষজ্ঞ বাঁধন সেনগুপ্ত এই হামলাকে জঘন্য ও নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইতিহাসে এই ধরনের কাজ সব সময়ই হুলিগানদের দ্বারা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ দ্রুত ছায়ানটকে আবার এগিয়ে নিয়ে যাবেন।
পশ্চিমবঙ্গের নজরুলগীতি শিল্পী ইন্দ্রাণী সেন বলেন, রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা একটি বড় সাংস্কৃতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এভাবে তছনছ করে দেওয়া কল্পনাতীত। তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। একই সুর শোনা যায় সঙ্গীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লার বক্তব্যেও। তিনি বলেন, সনজীদা খাতুনের স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাওয়া গভীর বেদনার।
লেখক অমর মিত্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে তিনি আতঙ্কিত। নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তী বলেন, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার চেষ্টা মানেই একটি দেশের পরিচয়কে আঘাত করা। তার মতে, সংস্কৃতি টিকে থাকলেই দেশ রক্ষা পায়।
শান্তিনিকেতনের আশ্রমিকদের মধ্যেও এই ঘটনায় শোক ও ক্ষোভ দেখা গেছে। কবিগুরুর পরিবারের সদস্য সুপ্রিয় ঠাকুর বলেন, সনজীদা খাতুনের আজীবনের শ্রমে গড়ে ওঠা ছায়ানট ধ্বংস হওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
এদিকে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলার ঘটনাতেও পশ্চিমবঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। হামলার সময় অফিসে আটকে পড়েন সাংবাদিকরা। কলকাতা প্রেস ক্লাব এই ঘটনাকে ‘ন্যক্কারজনক’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। ক্লাবের সম্পাদক কিংশুক প্রামাণিক বলেন, সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তাদের ওপর আক্রমণ মানেই গণতন্ত্রের ওপর আঘাত।
একই সঙ্গে খুলনায় সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন হত্যার খবরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে হামলা নিঃসন্দেহে ধিক্কারযোগ্য। আর ছায়ানট বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অহংকার।
সিনিয়র সাংবাদিক সুদীপ্ত সেনগুপ্ত বলেন, বাংলাদেশে এমনিতেই অস্থির পরিস্থিতি চলছে। তার মধ্যে সংবাদমাধ্যমের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকাটা উদ্বেগজনক। তিনি দাবি করেন, হামলাকারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস অনেকের নেই। এটিই স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে সংস্কৃতি ও সংবাদমাধ্যমের ওপর ধারাবাহিক হামলা দুই বাংলাতেই গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি আরো জোরালো হচ্ছে।
logo-1-1740906910.png)