পর্যাপ্ত সেবা থেকে বঞ্চিতই থাকছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৪৯
উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান হাজারো বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী। তাদের শ্রম ও মেধায় অর্জিত আয় দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। রেমিট্যান্সে সচল থাকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঘুরতে থাকে অর্থনৈতিক চাকা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিদেশে অবস্থানরত এই প্রবাসীরাই নানা ভোগান্তি, অব্যবস্থা ও সেবা সংকটে দিন কাটাচ্ছেন- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এমন প্রেক্ষাপটে ১৮ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হবে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। দিবসটি সামনে রেখে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একসঙ্গে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস–২০২৫’ এবং ‘জাতীয় প্রবাসী দিবস–২০২৫’। দিবসটি উপলক্ষে আলোচনায় উঠে এসেছে প্রবাসীদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং দূতাবাসকেন্দ্রিক সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর কয়েক হাজার শিক্ষার্থী উন্নত শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। পড়াশোনার পাশাপাশি অনেকেই সেখানে খণ্ডকালীন বা পূর্ণকালীন কাজ করে আয় করেন এবং দেশে অর্থ পাঠান। তবে এসব দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, জরুরি প্রয়োজনে দূতাবাসে যোগাযোগ করাও সহজ নয়। আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর সেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতেও অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। কেউ কেউ দূতাবাসে সেবা পেতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন।
রাশিয়ায় অধ্যয়নরত পিএইচডি শিক্ষার্থী আবুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবীরা সেখানে বাড়লেও দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো গাইডলাইন বা নিয়মিত যোগাযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় বা খোঁজখবর নেওয়ার উদ্যোগও চোখে পড়ে না। এমনকি হটলাইন নম্বর থাকলেও খুব কম সময় ফোন রিসিভ করা হয় বলে অভিযোগ তার।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী নাইম। তার মতে, দূতাবাসে গেলে যে কোনো কাজেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়। নিয়ম মেনে চললেও নানা জটিলতা দেখানো হয়, ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপে পড়েন।
শুধু শিক্ষার্থী নয়, বিদেশে অবস্থানরত অভিবাসী কর্মী ও পেশাজীবীরাও নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসী মাসুদ রানা জানান, পাসপোর্ট হাইকমিশন থেকে ডেলিভারি দেওয়ার পর সেটি আবার ই-স্কেলে গিয়ে অ্যাক্টিভ করতে হয়। এতে দুই দিন পর্যন্ত সময় নষ্ট হচ্ছে। অথচ চাইলে একই প্রক্রিয়ায় কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি কল সেন্টার সংকটের কারণে দূতাবাসে সহজে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন।
ইতালিতে পরিবারসহ বসবাসরত পেশাজীবী সাজেদুল হক জানান, জমিজমা বা পারিবারিক নানা প্রয়োজনে দূতাবাসে যেতে হয়। কিন্তু প্রতিটি কাজেই সময় পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। এতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বিলম্ব হয়।
তবে এসব সমস্যার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাবলিক ডিপ্লোমেসি বিভাগের মহাপরিচালক এস এম মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, কিছু দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী সেবাপ্রত্যাশীদের বিভ্রান্ত করে জটিলতা তৈরি করে। তবে এ ধরনের সমস্যা ধীরে ধীরে কমছে এবং ভবিষ্যতে আরো কমবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে এক বছরেও চালু হয়নি মালয়েশিয়া, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। এর আগে বন্ধ হওয়া ৯টি শ্রমবাজারের একটিও এখনো খোলা সম্ভব হয়নি। ফলে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার কমছে বলে আশঙ্কা করছেন জনশক্তি রপ্তানি খাতের সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত নতুন বাজার খোলা ও পুরোনো বাজার পুনরায় চালুর দাবি তাদের।
সৌদি আরবেও দেখা দিচ্ছে নতুন জটিলতা। যদিও চলতি বছরে বিদেশগামী মোট কর্মীর অর্ধেকের বেশি সৌদি আরবে গেছেন, তবুও ‘তাকামুল’ সনদ, ইকামা, চাকরি ও বেতনসংক্রান্ত নানা সমস্যার অভিযোগ করছেন কর্মীরা। এসব অনিশ্চয়তায় উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
বিশ্ব অভিবাসী দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, জাতীয় অর্থনীতি ও অগ্রগতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা অপরিসীম। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে প্রবাসীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে কিনা, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠছে।
logo-1-1740906910.png)