সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি জেলা কেঁপে উঠেছে ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে। এর আগে মরক্কোর মধ্যাঞ্চলে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বহু ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর কয়েক মাস আগেই তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্তে দুটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং আরো অনেকে আহত বা আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিলেন। এসব ভূমিকম্প কোনো সতর্কতা ছাড়াই হঠাৎ আঘাত হানে। বিবিসি নিউজ ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ভূতত্ত্ববিদরা জানান, ভূমিকম্প হওয়ার পর ভূকম্পনজনিত ডেটা থেকে কিছু সংকেত পাওয়া যায়। তবে এগুলোকে ব্যবহার করে আগাম পূর্বাভাস দেওয়া জটিল। ইতালির রোমের সেপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস ম্যারোন বলেন, পরীক্ষাগারে ভূমিকম্পের সময় কিছু ফাটল ও ত্রুটি দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃতিতে এত অনিশ্চয়তা থাকে যে বড় ভূমিকম্পের আগাম ইঙ্গিত পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
১৯৬০ সাল থেকে ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের জন্য আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও খুব সামান্য সফলতা এসেছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরে টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ থেকে প্রচুর আওয়াজ তৈরি হয়, যা দৈনন্দিন জীবনের শব্দের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে ভূমিকম্পের স্পষ্ট সংকেত আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বলছে, একটি ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে হলে কোথায়, কখন এবং কত বড় আকারে ঘটবে- এই তিনটি বিষয় জানা জরুরি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউই তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি।
তবে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা প্রাকৃতিক বিপদ মানচিত্র তৈরি করে কয়েক বছরের সময়সীমায় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা হিসাব করেন। এতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভবন নির্মাণে কিছুটা সহায়তা হয়, কিন্তু জনসাধারণকে সরিয়ে নেওয়ার মতো আগাম সতর্কতা দেওয়া সম্ভব হয় না।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদম অতীতের ভূমিকম্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন নমুনা খুঁজছে, যা ভবিষ্যতে পূর্বাভাসে কাজে লাগতে পারে। পরীক্ষাগারে ছোট আকারের গ্রানাইট ব্যবহার করে চাপ ও ঘর্ষণ তৈরি করে গবেষকরা দেখেছেন, ফোরশক বা মৃদু কম্পনের শব্দ থেকে কখন চ্যুতি ঘটবে তা অনুমান করা যায়। তবে বাস্তব পৃথিবীর জটিল পরিবেশে এটি প্রয়োগ করা এখনো কঠিন।
চীন আয়নমণ্ডলের বৈদ্যুতিক অসঙ্গতি পর্যবেক্ষণের জন্য স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। তারা দাবি করেছে, বড় ভূমিকম্পের কয়েক দিন আগে আয়নমণ্ডলে ইলেকট্রনের ঘনত্ব পরিবর্তন হয়। ইসরায়েলি গবেষকরা বলছেন, তারা ৮৩ শতাংশ নির্ভুলতার সঙ্গে ৪৮ ঘণ্টা আগে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এসব দাবি এখনো বিতর্কিত এবং নিশ্চিতভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়।
জাপানে গবেষকরা জলীয় বাষ্পের পরিবর্তনকে পূর্বাভাসের সূত্র হিসেবে দেখছেন। তাদের পরীক্ষায় ৭০ শতাংশ নির্ভুলতা পাওয়া গেছে, তবে তারা কেবল বলতে পারেন যে নির্দিষ্ট মাসে ভূমিকম্প হতে পারে। ফলে কোনো দেশেই এখনো এমন কোনো প্রযুক্তির উদ্ভাবন সম্ভব হয়নি, যার মাধ্যমে ভূমিকম্পের নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া যেতে পারে।
logo-1-1740906910.png)