Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

মুসলিম বিশ্বে ওয়াহাবি ও সালাফি কারা?

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫, ১০:১৭

মুসলিম বিশ্বে ওয়াহাবি ও সালাফি কারা?

বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ঘটনা ও ধর্মীয় আলোচনায় ওয়াহাবি ও সালাফি প্রসঙ্গ উঠে আসছে। বিশেষ করে সুফি, পীর বা বাউলদের ওপর হামলার পর এ নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। তবে এসব হামলার সঙ্গে ওয়াহাবি বা সালাফিদের সরাসরি সম্পর্ক আছে কিনা তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি বিবিসি বাংলা এ নিয়ে প্রকাশ করেছে এক বিশেষ প্রতিবেদন।

প্রতিবেদন বলছে, দেশের অনেক মসজিদে জুমার নামাজের আগে ইমামদের বয়ানে কখনো সালাফিদের সমালোচনা, আবার কখনো ওয়াহাবিদের সমালোচনা শোনা যায়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে- ওয়াহাবি ও সালাফি কারা? তারা কি একই ধারার? নাকি ভিন্নমতাবলম্বী?

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে মুসলিমদের মধ্যে চারটি ধারা সক্রিয়- ওয়াহাবি, সালাফি, দেওবন্দ ও সুফি। মাজহাবের দিক থেকে হানাফি অনুসারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ইতিহাসে ফরায়েজি আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনসহ নানা ক্ষেত্রে ওয়াহাবি ধারার প্রভাব ছিল। হাজী শরিয়ত উল্লাহ ও তিতুমীর ছিলেন ওয়াহাবি ঘরানার গুরুত্বপূর্ণ নেতা।  

ওয়াহাবি ধারার সূচনা হয় অষ্টাদশ শতকে সৌদি আরবে আবদুল ওয়াহাব নজদির মাধ্যমে। তিনি কবর, মাজার ও পূজা প্রথার বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে সালাফি ধারার সূচনা হয় মিসরের দার্শনিক মুহাম্মদ আব্দুহর হাত ধরে। তারা ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম—সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনকে আদর্শ হিসেবে মানেন।  

গবেষকরা বলছেন, সুফিদের মাধ্যমে ইসলাম এ অঞ্চলে বিস্তার লাভ করেছে। সুফিরা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মকে মিশিয়ে প্রচার করেছেন। কিন্তু ওয়াহাবি ও সালাফিরা ইসলামের কঠোর ব্যাখ্যা অনুসরণ করেন। ফলে পীর, দরগাহ ও সুফি প্রথার সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।  

চট্টগ্রাম ইনডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী মো. সাইফুল আসপিয়া বলেন, ওয়াহাবি-সালাফিরা ইসলামের কঠোর ব্যাখ্যা মানে। তবে এ ধারণাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে কিছু গোষ্ঠী জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়েছে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাফী মো. মোস্তফা বলেন, ওয়াহাবি ও সালাফি ধারণার উৎস একই হলেও তাদের ব্যাখ্যায় পার্থক্য আছে। তিনি উল্লেখ করেন, সালাফি চিন্তাধারা উনিশ শতকে মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়। এ ধারার নেতৃত্ব দেন মুহাম্মদ আব্দুহ, জামাল উদ্দিন আল-আফগানি ও রাশিদ রিদা। ভারতীয় উপমহাদেশে এরা আহলে হাদিস নামে পরিচিত হন।  

বাংলাদেশে বর্তমানে অনেকেই ওয়াহাবি ও সালাফি ধারার অনুসারী হলেও তাদের বড় পরিচিতি ‘আহলে হাদিস’ নামে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম হানাফি মাজহাবের অনুসারী।  

বাংলাপিডিয়ার তথ্যে বলা হয়েছে, ওয়াহাবিরা অলৌকিক ক্ষমতা বা ওলিদের বিশেষ মর্যাদায় বিশ্বাস করেন না। তারা সমাধি বা মাজারকে বৈধ মনে করেন না। সৌদি আরবে নবীজীর সমাধি ছাড়া অন্য কোনো স্মৃতিচিহ্ন রাখা হয়নি।  

সৌদি আরব ওয়াহাবি মতবাদ বিস্তারে অর্থায়ন করেছে বলে প্রচার আছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, স্নায়ুযুদ্ধের সময় মুসলিম দেশগুলোতে সোভিয়েত প্রভাব ঠেকাতে সৌদি আরবকে মসজিদ ও মাদ্রাসায় বিনিয়োগ করতে বলা হয়েছিল। পরে এ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।  

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাজার ও বাউলদের ওপর হামলার ঘটনায় ওয়াহাবি ও সালাফি মতাদর্শের কিছু অনুসারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালে উগ্রবাদীদের হুমকির কারণে লালন মেলা বন্ধ হয়ে যায়।  

গবেষকরা বলছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের নৈকট্যের কারণে এ ধারণা বেশি আলোচনায় এসেছে। অনেক বাংলাদেশি সৌদি আরবে গিয়ে ফিরে এসে ওয়াহাবি ও সালাফি মতবাদ প্রচার করছেন। এতে স্থানীয় সুফি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।  

সব মিলিয়ে বলা যায়, ওয়াহাবি ও সালাফি মতবাদ বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইতিহাসে তাদের উপস্থিতি পুরনো হলেও সাম্প্রতিক হামলা ও বিতর্কের কারণে বিষয়টি আবারো গুরুত্ব পেয়েছে।

Logo