Logo
×

Follow Us

এশিয়া

মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ পাচ্ছেন প্রবাসীদের স্বামী-স্ত্রী

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ২১:৫৯

মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ পাচ্ছেন প্রবাসীদের স্বামী-স্ত্রী

বিদেশি দক্ষ কর্মীদের আকৃষ্ট করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। দেশটিতে কর্মরত বিদেশিদের স্বামী বা স্ত্রীকে কাজের অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নির্দিষ্ট শর্তে এ সুবিধা কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে বিদেশি পেশাজীবীদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদেরও কর্মজীবন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত অক্টোবরে ২০২৭ সালের বাজেট ঘোষণার সময় এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, দেশটিতে সর্বোচ্চ ক্যাটাগরির ক্যাটাগরি-১ কর্মসংস্থান পাসধারী বিদেশিদের স্বামী বা স্ত্রী কাজ করার সুযোগ পাবেন। এ শ্রেণির ভিসা পেতে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্মীর মাসিক বেতন কমপক্ষে ২০ হাজার মালয়েশীয় রিঙ্গিত হতে হবে, যা প্রায় ৪ হাজার ৯০০ মার্কিন ডলারের সমান।

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় কর্মরত বিদেশিদের স্বামী বা স্ত্রী সাধারণত নির্ভরশীল ভিসা নিয়ে বসবাস করেন। তাদের চাকরি করতে হলে আলাদা নিয়োগকর্তার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান পাস নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আগের নির্ভরশীল ভিসা ছেড়ে দিতে হয়। তবে নতুন নীতিতে যোগ্য ব্যক্তিরা নির্ভরশীল ভিসা বহাল রেখেই কাজ করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও এ সুবিধা কার্যকরের বিস্তারিত শর্ত এখনো প্রকাশ করেনি সরকার।

মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের পুনর্বাসন ও বসবাসসংক্রান্ত পরামর্শ দিয়ে থাকেন যুক্তরাজ্যের নাগরিক জশুয়া ওয়েবলি। তার অভিজ্ঞতায়, বিদেশি কর্মীদের অনেক পরিবার দেশটিতে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এর অন্যতম কারণ, কর্মরত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী নিজ যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও সেখানে চাকরি পান না। ফলে পরিবারের একজনের কর্মজীবন এগোলেও অন্যজনকে পেশাগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়।

মালয়েশিয়া এই পরিস্থিতি বদলে আন্তর্জাতিক দক্ষ জনশক্তির কাছে নিজেদের আকর্ষণীয় করে তুলতে চায়। দেশটির মানবসম্পদ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, স্বামী বা স্ত্রীর কাজের সুযোগ না থাকা শুধু পরিবারের বাড়তি আয়ের পথ বন্ধ করে না, বরং তাদের পেশাগত পরিচয়, আর্থিক স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতে চাকরিতে ফেরার সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মালয়েশিয়া এইচআর ফোরামের প্রধান নির্বাহী অরুলকুমার সিঙ্গারাভেলু মনে করেন, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বিশেষ করে যেসব দম্পতির দুজনই পেশাজীবী, তাদের কাছে দেশটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। একইভাবে মালয়েশিয়ান এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনও উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। সংগঠনটির সভাপতি নিক মুস্তাফা নিক মোহামেদের মতে, এ সুবিধা বিদেশি দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করবে। পাশাপাশি পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়ায় বসবাসের আর্থিক ও ব্যক্তিগত চাপ কমবে।

তবে নতুন নীতি নিয়ে কিছু সংশয়ও রয়েছে। মালয়েশিয়াভিত্তিক অর্থনীতিবিদ জিওফ্রে উইলিয়ামসের মতে, স্বামী বা স্ত্রীকে কাজের অনুমতি দেয়া ভিসাব্যবস্থায় একটি সীমিত পরিবর্তন মাত্র। বিদেশি পেশাজীবীদের দীর্ঘমেয়াদি ভিসা ও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার জটিলতা এখনো বড় বাধা। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে দীর্ঘ সময়ের জন্য মালয়েশিয়ায় কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবন গড়তে আগ্রহী ব্যক্তিরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিদেশি কর্মীদের তিন ধরনের কর্মসংস্থান পাসের জন্য ন্যূনতম বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দেয় মালয়েশিয়া সরকার। পাশাপাশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্যাটাগরির বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা বা ‘সাকসেশন প্ল্যান’ বাধ্যতামূলক করা হয়। গত জুন থেকে এসব নিয়ম কার্যকর হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, বিদেশি কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জনশক্তির দক্ষতা বাড়ানো।

নতুন সুবিধার কার্যকারিতা নির্ভর করবে স্বামী বা স্ত্রীরা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন কি না এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া কতটা সহজ হচ্ছে, তার ওপর। সম্ভাব্য কর্মক্ষেত্র হিসেবে প্রযুক্তি, প্রকৌশল, অর্থায়ন, আঞ্চলিক ব্যবসা পরিচালনা, পেশাগত সেবা ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের কথা উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

নিয়োগকর্তাদের সংগঠনটি নতুন নীতির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগেভাগেই স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিদ্যমান নির্ভরশীল ভিসায় অনুমোদন যুক্ত করেই কাজ করা যাবে, নাকি আলাদা কর্মানুমতি নিতে হবে— এ বিষয়গুলো পরিষ্কার করার তাগিদ দিয়েছে তারা। একই সাথে প্রতিটি নিয়োগকর্তা বা পদের জন্য পৃথক অনুমোদন প্রয়োজন হবে কি না, সেটিও নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করছে সংগঠনটি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নিয়মে যোগ্য স্বামী বা স্ত্রীদের জন্য প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও অন্যান্য বিশেষায়িত পেশায় কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে স্থানীয় কর্মীদের কর্মসংস্থান সুরক্ষায় তাদের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম বেতন বা বিশেষ যোগ্যতার শর্ত থাকতে পারে। ফলে নতুন নীতির অর্থ এই নয় যে, নির্ভরশীল ভিসাধারীরা ইচ্ছামতো যেকোনো চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন।

নতুন সিদ্ধান্তের প্রভাব ইতিমধ্যে বিদেশি কর্মী নিয়োগের বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নির্বাহী পর্যায়ের কর্মী নিয়োগে কাজ করা প্রতিষ্ঠান কনটাগির ব্যবস্থাপনা অংশীদার অ্যালেক্স বার্গহোফেন জানান, আগে মালয়েশিয়ায় চাকরির প্রস্তাব পেয়েও এক বিদেশি পেশাজীবী তার স্বামী বা স্ত্রীর কাজের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। নতুন নীতির খবর পাওয়ার পর পরিবারটি আবার মালয়েশিয়ায় যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায়ও এ উদ্যোগ মালয়েশিয়াকে এগিয়ে রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সিঙ্গাপুরে নির্দিষ্ট উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের স্বামী বা স্ত্রী কাজের সুযোগ পেলেও সে সুবিধা পেতে মাসিক বেতনের শর্ত মালয়েশিয়ার তুলনায় অনেক বেশি। অন্যদিকে থাইল্যান্ডে অননুমোদিত ব্যবসা ও অবৈধ কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি বাড়ছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরে জীবনযাত্রার ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি।

এছাড়া ডিজিটাল যাযাবরদের জন্যও অবস্থানকাল বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে মালয়েশিয়া। দেশটির ডিই রান্তাউ নম্যাড পাসধারীরা নির্ধারিত দুই বছর পূর্ণ করার পর শর্তসাপেক্ষে আরো দুই বছর দেশটিতে থেকে দূরবর্তী কাজ করতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি দক্ষ জনশক্তি আকর্ষণে মালয়েশিয়ার নতুন উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও শুধু কাজের অনুমতি দিলেই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা নিশ্চিত হবে না। পেশাগত সুযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং পরিবারের জন্য অনুকূল পরিবেশ— সব মিলিয়েই বিদেশি কর্মীদের কাছে দেশটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।

Logo